মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিভাগ মাৎস্যবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি শব্দটাই বলে দিচ্ছে এ বিভাগের পড়াশোনা সমুদ্র ও সামুদ্রিক মাছ নিয়ে। পৃথিবীতে স্থলভাগের চেয়ে জলভাগের অংশ বেশি; শতকরা ৭১ শতাংশ হলো জল, বাকিটা স্থল। এ বিশাল জলরাশিতে রয়েছে অনেক ধরনের বৈচিত্র্যময় মাছ, বিভিন্ন ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদ। আমাদের জীবনধারণের জন্য যে অক্সিজেনের প্রয়োজন, এর একটা বড় অংশ আসে সমুদ্র থেকে, অর্থৎ সামুদ্রিক উদ্ভিদ কণা থেকে। আবার উত্তাল সমুদ্রের কারণে বড় রকমের দুর্যোগ ঘটতে পারে যেমন সাইক্লোন, সুনামি ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে তাকিয়ে আছেন সমুদ্রবক্ষের সঞ্চিত সম্পদের দিকে। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর খাবার জোগান দিতে তখন সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে সমুদ্র অর্থনীতি নানাভাবে অবদান রেখে চলেছে। প্রতি বছর ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে সমুদ্র ঘিরে। বিশ্বের ৪০৩ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু, ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র থেকে। সমুদ্র সম্পর্কে পড়াশোনা ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
বর্তমানে পৃথিবীতে সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি বেশ সম্ভাবনাময়। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পর সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ৩৫৪ মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সবধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের অধিকৃত এ বিশাল অঞ্চলের সামুদ্রিক মাছ হতে পারে বছরে বিলিয়ন ডলারের রফতানি পণ্য। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় রয়েছে সীমাহীন সম্পদ। শুধু আবিষ্কারের অপেক্ষায়। এ সম্পদ দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দেবে। এছাড়া খনিজ, জ্বালানি সম্পদ প্রতিনিয়তই জমছে বঙ্গোপসাগরের বুকের ভেতর। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পলিমাটি জমছে বছরে ২০০ কোটি টন। টেনে আনছে নদী। এতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ, জ্বালানি সম্পদ জমা হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে।
বঙ্গোপসাগরে তেল, গ্যাস ও ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভারী খনিজের মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, কোবাল্টসহ অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এসব সম্পদ থেকে বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির ৯০ শতাংশই সম্পাদিত হয় সমুদ্রপথে। ফলে ভবিষ্যতে সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও বৃদ্ধি পাবে, সেসঙ্গে বৃদ্ধি পাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান। আমাদের দেশে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ অথবা জীবজগৎ, সমুদ্রের ভৌত, রাসায়নিক ও ভূতাত্ত্বিক বিষয়ে এখনো গবেষণা হয়নি। বঙ্গোপসাগর সম্পর্কিত বহু বিষয় এখনো অজানা। কাজেই বাংলাদেশে সমুদ্রবিজ্ঞানে প্রচুর গবেষণার ক্ষেত্র রয়েছে। সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে সামুদ্রিক মৎস্য এবং টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, সমুদ্র দূষণ, জলবায়ুর প্রভাব এবং অন্যান্য বিরূপ অবস্থা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য সমুদ্র সম্পর্কিত সব ধরনের তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন। কিন্তু দেশে সমুদ্র গবেষণার ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। কাজেই এ বিষয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। দেশে ও বিদেশে সামুদ্রিক মৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্র ব্যাপক ও বিস্তৃত।
মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ গ্র্যাজুয়েটরা বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্পারসো, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট, ব্লু ইকোনমি সেল এবং বিসিএস ক্যাডারে কাজের সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি অনেকেই বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউএনডিপি, এফএও, ওয়ার্ল্ড ফিশ, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড প্রভৃতিতে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ব্লু কার্বন গবেষণা, ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোতেও চাকরির সুযোগ বাড়ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যানালিস্ট, ব্লু কার্বন স্পেশালিস্ট, কোস্টাল রেজিলিয়েন্স অফিসার কিংবা মেরিন পলিসি অ্যানালিস্ট হিসেবেও ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারবেন।
আবদুল্লাহ-আল-হাসান: সহকারী অধ্যাপক, মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিভা
