প্রকাশিত:২৯আগষ্ট২০২৫
ইলিশকে বলা হয় মাছের মধ্যে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ! তাকে কিন্তু সব জায়গায় দেখা যায় না। নদীতে ধরা পড়লেও সব নদীতে সমানভাবে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের জীবনচক্র অনেকটা রহস্যময়। এদের জন্ম হয় নদীতে, বেড়ে ওঠা সাগরে আবার প্রজননের জন্য ফিরে আসতে হয় নদীতে।
ইলিশের জীবনধারা প্রকৃতির এক বিস্ময়। ধারণা করা হয়, পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ মাধ্যমে নিজেদের জন্মস্থান চিনে নিতে পারে ইলিশ। এজন্য সাগরের লোনা পানি ছেড়ে তারা বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে আবার নদীতে ফিরে আসে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মৎস্য অধিদফতরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, এদের জন্ম সাধারণত মিঠা পানিতে হয়-বিশেষ করে পদ্মা, মেঘনা, তেতুলিয়া নদীর মতো নদীতে। এখানেই সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে তারা ডিম ছাড়ে এবং এরপর ছয় থেকে সাত মাস নদীতে থাকে। সাধারণত এপ্রিলের শেষ দিকে বা মে মাসের প্রথম দিকে ইলিশ আবার সাগরের দিকে চলে যায়।
জন্মের পর ছয় থেকে সাত মাস নদীতে থাকার কারণ হলো- ছোট বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত লবণাক্ততা, তাপমাত্রা এবং খাবারের ব্যবস্থা থাকে নদীতে। মূলত খাবারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইলিশ জানে, তার বাচ্চাদের খাবার কোথায় আছে, ঠিক সেখানে ডিম ছাড়ে। গবেষণা করতে গিয়ে আশ্চর্যজনক একটি বিষয় দেখেছি, কোনো একটা নির্দিষ্ট জায়গা অসংখ্য ডিম দিয়েছে মা ইলিশ কিন্তু তার মাত্র এক কিলোমিটার দূরেও কোনো ডিম নাই। কারণ, সেখানে বাচ্চাদের উপযুক্ত খাবার নাই।
ইলিশকে কেন সাগরে ফিরতেই হয়?
এখানে একটা বড় কারণ হলো- খাবার। ২০১৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাগরে ইলিশের খাদ্যভাণ্ডার অনেক বেশি থাকে, যা তাদের বৃদ্ধি ও প্রজনন সক্ষমতা বাড়ায় ।
নদীতে বাচ্চা ইলিশের জন্য পর্যাপ্ত খাবার থাকে টিকই কিন্তু ইলিশ যখন বড় হয় তখন তারা নদীতে পর্যাপ্ত খাবার পায় না। সাগরে প্ল্যাঙ্কটন, ক্রিল ও ছোট মাছ প্রচুর থাকে, যেগুলো খেয়ে ইলিশ দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। এছাড়া পরিবেশগত সুবিধার ব্যাপারও রয়েছে। সাগরের পানি ধীরগতির এবং নদীর তুলনায় অনেক বড় জলাশয়।
নদীতে ইলিশ যদি থেকে যেতো তাহলে খাবার ও স্থান নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রোগের ঝুঁকি বেশি তৈরি হতো। সাগরে গেলে এই ঝুঁকি কমে যায়। এভাবেই সাগরে বড় হয়ে ইলিশের প্রজনন সক্ষমতা পূর্ণ হয়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তারা আবার নদীতে আসে।
২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন ও প্রজনন প্রক্রিয়া ইলিশের টেকসই অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশ সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে প্রজনন করে, যা বর্ষাকালীন মৌসুমের সাথে মিলে যায়। এই সময় নদীর পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা উপযুক্ত থাকে। ইলিশের জীবনচক্রে বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। যেমন- ডিম, লার্ভা, পোনা, কৈশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক মাছ। এই ধাপগুলি নদী ও সাগরের পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। নদীর মিঠা পানি ছোট ইলিশ বা লার্ভার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে।
কৈশোরে এসে ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, ইলিশেরা ঝাঁক বেঁধে সাগরে যায়, আলাদা নয়। আমরা দেখেছি, চাঁদপুর থেকে ইলিশ রওনা হওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে নদী থেকে সাগরের মোহনায় পৌঁছে যায়। এরপর প্রায় এক বছর পর তারা আবার নদীতে ফিরে আসে। সাধারণত এই যাত্রা অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময় ঘটে, যখন তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ঝাক ধরে ইলিশ একসঙ্গে সাগরের দিকে চলে যায়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কৌশল’ শীর্ষক একটি প্রযুক্তি নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছিল। এতে বলা হয়, ইলিশ মাছের গোনাডের হিস্টোলজিক্যাল বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, সাধারণত ১+ বৎসর বয়সে ইলিশ মাছ পরিপক্বতা লাভ করে। তবে আবহাওয়ার তারতম্য ও অন্যান্য কারণে অনেক সময় ৮-১০ মাস বয়সেও ইলিশ মাছ পরিপক্ব হতে পারে।
স্বনামধন্য ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বলেন, একটা ইলিশ সর্বোচ্চ সাত বছরের মতো বাঁচে। তবে যেসব বড় ইলিশ বাজারে পাওয়া যায় তার বয়স সাধারণত দুই বা তিন বছর। এর বেশি বয়সী ইলিশই খুব কম ধরা পড়ে।
