বাজারে গেলেই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মাছ মহালে ঢুঁ মারি। সঙ্গে বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়পরিজন থাকলে আমার এ অভ্যাসে অনেকেই বিরক্ত হন। মাছ মহালে মাছের প্রাপ্যতা, উৎস্য ও বৈচিত্র্য দেখতে আমার ভালো লাগে। এটা আমার পুরনো অভ্যাস।সময়ের পরিক্রমায় মাছ মহালে বেশ পরিবর্তন এসেছে। বাজারভর্তি এখন চাষের মাছ। প্রাকৃতিক উৎসর মাছ তুলনামূলক অনেক কম। বাজারে কার্পজাতীয় মাছের মধ্যে রুই-কাতলা প্রধান প্রজাতি।কালীবাউসের উপস্থিতি মাঝে মধ্যে দেখা মিললেও এর আদি চেহারা আর নেই। ক্রস হয়ে দেহে ভিন্ন এক ফ্যাকাসে রং ধারণ করেছে। গনিয়া মাছ নেই বললেই চলে, কদাচিৎ দেখা মেলে। গনিয়া মাছ সংকটাপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায়।অনেকেই এই মাছটিকে এখন চেনে না। আজ গনিয়া মাছ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করব।
গনিয়া মাছ মূলত মিঠা পানির নদীর মাছ। Cyprinidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত গনিয়া মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Labeo gonius (Hamilton 1822)। অঞ্চলভেদে এ মাছকে গৈন্না বা ঘুনিয়া নামে ডাকা হয়।
এর ইংরেজি নাম কুরিয়া ল্যাবিও (Kuria labeo)। বাংলাদেশ ছাড়া নেপাল, ভারত, মায়ানমার, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে গনিয়া মাছ পাওয়া যায়। গনিয়া মাছের দেহ লম্বা এবং মুখ ভোঁতা ও দেহের তুলনায় মুখ অনেক ছোট হয়। দেহের রং কালচে সবুজ বা জলপাই সবুজ এবং আঁইশ অন্যান্য কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় ছোট। এদের মুখে দুই জোড়া ছোট ছোট স্পর্শী আছে, এর মধ্যে এক জোড়া চঞ্চুতে এবং অন্য জোড়া নিচের চোয়ালে অবস্থিত। এরা লম্বায় সর্বোচ্চ ৩১ সেন্টিমিটার এবং ওজনে দেড় কেজি পর্যন্ত পাওয়া গেছে। স্বচ্ছ পানির নদী বা হ্রদে এরা বসবাস করে।
গনিয়া সর্বভুক শ্রেণির মাছ। উন্মুক্ত জলাশয়ে এরা প্ল্যাঙ্কটন, শেওলা কিংবা ক্রাস্টাসিয়ান জাতীয় খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করে। দেড় থেকে দুই বছর বয়সে গনিয়া মাছ প্রজননক্ষম হয়। পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছের তুলনায় আগে পরিপক্ব হয়। বর্ষাকালে এরা নদ-নদীতে প্রজনন করে। ভারি বর্ষায় এরা ডিম ছাড়ে এবং ডিম দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে রেণু বের হয়ে আসে। জুন মাস এদের সর্বোচ্চ প্রজননকাল। এক কেজি ওজনের একটি স্ত্রী গনিয়া মাছ আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। এদের ডিম ভাসমান প্রকৃতির এবং আঠালো নয়। দেশে এরই মধ্যে গনিয়া মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। রুইজাতীয় অন্যান্য মাছের সঙ্গে গনিয়া মাছের মিশ্র চাষ করা যায়। পুকুরে চাষ করার সাত-আট মাসেই মাছ বাজারজাতযোগ্য হয়। গনিয়ার বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে অনেক। উল্লেখ্য, গনিয়ার চাষ সম্প্রসারণে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে পর্যাপ্ত পোনার অভাব। গনিয়ার চাষ প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়ানো প্রয়োজন।
আইইউসিএনের (২০১৫) তথ্য মতে দেশে বিপন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা ৬৪টি। এর মধ্যে গনিয়াও একটি বিপন্ন প্রজাতি। বিপন্ন প্রজাতির মাছকে সুরক্ষা কিংবা পুনরুদ্ধার করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা গেছে, তিন-চার বছরে একটি মাছ পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে ভিন্ন প্রজাতির আরেকটি মাছ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এর মূল কারণ—জলজ পরিবেশ বিপর্যয় এবং অতি আহরণ। এসব বিপন্ন প্রজাতির মাছকে সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এক হাজার ১১৯টি হ্যাচারি রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি হ্যাচারি ১১২টি এবং এক হাজার সাতটি বেসরকারি। এসব হ্যাচারিতে বছরে মোট পাঁচ লাখ ৮১ হাজার রেণু উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৩ শতাংশ উৎপাদন করে সরকারি হ্যাচারি।
এসব সরকারি হ্যাচারিতে মূলত রুইজাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন করা হয়। উল্লেখ্য, মৎস্য অধিদপ্তরের কারিগরি সহযোগিতায় রুইজাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনে বেসরকারি হ্যাচারিগুলো এরই মধ্যে যথেষ্ট দক্ষতা ও সফলতা অর্জন করেছে। তাই এখন অঞ্চলভিত্তিক কয়েকটি নির্বাচিত সরকারি হ্যাচারিতে রুইজাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে বিপন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদনে জোর দেওয়া প্রয়োজন। এতে বিপন্ন প্রজাতির মাছের পোনার প্রাপ্যতা সহজলভ্য হবে এবং চাষাবাদ বাড়বে। তা ছাড়া বিপন্ন প্রজাতির মাছের পোনা প্রতিবছর নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পাবে। অন্যদিকে দেশীয় মাছ যাতে নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে পারে, এ জন্য হাওরবেষ্টিত জেলাসমূহে অন্তত একটি হাওরকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা যাতে পারে।
বর্তমানে দেশে চার লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জলায়তনের পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। পুকুরে মাছের উৎপাদনের ক্ষেত্রে কার্পজাতীয় মাছ রুই-কাতলার অবদান প্রশংসনীয়। কিন্তু উৎপাদনে গনিয়া মাছের অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য। অথচ আকারে বড় হওয়ায় এ ক্ষেত্রে গনিয়াও একটি সম্ভাবনাময় প্রজাতি।
লেখক : কৃষিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ।
সূত্র: কালের কন্ঠ
