শুধু রিংকু বৈদ্য নয়, জেলার আরো ৮শ’ দরিদ্র জেলে পরিবারও এভাবে সরকারি অনুদানের ছাগল পালন করে সংসারে বাড়তি রোজগারের সুযোগ পেয়েছে। ওই পরিবারগুলোতেও এসেছে স্বচ্ছলতা।
গ্রামের অতি সাধারণ গৃহবধূ রিংকু বৈদ্য (৩২)। স্বামী অমল বৈদ্য, ছেলে রাজ বৈদ্য ও শ্বাশুড়ি করুণা বৈদ্যকে নিয়ে তার সংসার। স্বামী জলাশয়ে মাছ ধরে সংসার চালান। ছেলে ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। সামান্য আয় দিয়ে স্বামী ৪ জনের সংসারে চালাতে পারেন না। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। জরাজীর্ণ বসতঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরিবারটিতে দরিদ্রতা চরম আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারিভাবে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পরিবারটিকে বিনামূল্যে ২টি ছাগল দেয়া হয়। এ ছাগল ১১টি বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। গত কোরবানীর ঈদে ৮টি ছাগল ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এ টাকা দিয়ে রিংকু নতুন ঘর করছেন। ছাগল পালন করে ওই গৃহবধূ একটু একটু করে সংসার থেকে অভাব অনটন দূর করছেন। ছেলে স্কুলে যাচ্ছে। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরতে শুরু করেছে। রিংকু বৈদ্য গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অমল বৈদ্যর স্ত্রী।শুধু রিংকু বৈদ্য নয়, জেলার আরো ৮শ’ দরিদ্র জেলে পরিবারও এভাবে সরকারি অনুদানের ছাগল পালন করে সংসারে বাড়তি রোজগারের সুযোগ পেয়েছে। ওই পরিবারগুলোতেও এসেছে স্বচ্ছলতা।
দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুমে জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এ জন্য তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে দিতে গোপালগঞ্জ জেলার ৮শ’ পরিবারে ছাগল বিতরণ করা হয়। ছাগল পালন করে পরিবারগুলোতে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। তাই তারা মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে। এতে খাল, বিল ও জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘গোপালগঞ্জসহ ১০ জেলায় আমাদের এ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালে প্রকল্পের শুরুতে ১০ জেলায় দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ টন। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এসব জেলায় দেশীয় মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার টন । চলতি জুনে ১০ জেলায় মাছের উৎপাদন আরো ১৪ হাজার টন বৃদ্ধি পাবে। মাছের উৎপাদন ১৬% বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৬৪ টনে উন্নিত হবে বলে আমরা আশা করছি।’
নারকেলবাড়ি গ্রামের গৃহবধূ রিংকু বৈদ্য বলেন, ‘বাবার বাড়ির আবস্থা ভালো। ১৫ বছর আগে আমার বিয়ে হয়। স্বামীর মাঠে জমি নেই। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সংসারে অভাব অনটন লেগেই ছিল। স্বামী মাছ ধরে। যে মাছ পেত, তা দিয়ে সংসার চলে না। আমি জমিতে দিন মজুরের কাজ করেও কোনোভাবেই সংসারের অভাব অনটন দূর করতে পারিনি। শ্বশুরের সামান্য ভিটার বসতঘরটিও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে বসে। এ অস্থায় মৎস্য অফিস থেকে ২টি ভালো জাতের ছাগল পাই। পরম যত্নে লালন পালন কারি। ২২ মাসে ২টি থেকে ১৩টি ছাগল হয়। কোরবানীর সময় ৮টি ছাগল ৫০ হাজারে বিক্রি করেছি। এ টাকা দিয়ে বসতঘর করছি। স্বামী ও আমি সুযোগ পেলেই মাঠে দিন মজুরি করছি। ছেলে লেখাপড়া করছে। এখন আগের তুলনায় বেশ ভালো আছি। এখন পালে ৫টি ছাগল আছে। এ ছাগল ৩ বছর লালন পালন করলে পালে কমপক্ষে ৪০টি ছাগল হবে। ছাগল পালন করে আমি অভাব দূর করতে পারব।’
রিংকুর স্বামী অমল বৈদ্য বলেন, ‘ছাগলের জাত খুব ভালো। ৫/৬ মাসের মধ্যে একটি ছাগল ৬ থেকে ৮ কেজি ওজন হয়ে যায়। ছাগল বিক্রির উপযোগী হয়ে পড়ে। ছাগল পালন লাভজনক। ছাগল পেয়ে আমি প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। এ সময় ছাগলের ঘাস কাটি, আর বাজার ও মাঠে দিন মজুরের কাজ করি। এখন সংসার ভালো চলছে। প্রজনন মৌসুমে আমার মতো এলাকার অনেকে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে। এতে খাল-বিলে দেশী প্রজাতির মাছ বেড়েছে। মাছ আহরণ মৌসুমে খাল বিলে বেশি মাছ পাচ্ছি। ফলে দিন দিন আমাদের স্বচ্ছলতা বাড়ছে।’
দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি মো. খালিদুজ্জামান বলেন, ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে প্রকল্প থেকে গোপালগঞ্জসহ ১০ জেলার ৮ হাজার ৪০৫ পরিবারে দুটি করে ছাগল দেয়া হয়েছে। প্রজনন মৌসুমে মাছধরা বন্ধ রেখে ছাগল পালন করে তারা বিকল্প আয়ের সুযোগ পেয়েছে। এরমধ্যে কোটালীপাড়ার গৃহবধূ রিংকু অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার মতো ১০ জেলার ৮ হাজারেরও পরিবার ছাগল পালন করে পরিবারে বাড়তি আয় করছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এটিই হল এ প্রকল্পের অন্যতম সাফল্য।’
সূত্র: বণিক বার্তা
