সিডর, আইলা, মহাশেন, হামুন, বুলবুল, আম্পান ও সিত্রাং-সহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতি বর্ষণের মতো প্রকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করেই দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যজীবীগণ ‘মাছে ভাতে বাঙালি’র প্রবাদকে টিকিয়ে রেখেছে। যদিও মাঠ পর্যায়ে কারিগরি সহায়তাসহ নানা সীমাবদ্ধতায় মৎস্য খাতের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্যে উদ্বৃত্ত বরিশাল অঞ্চল। দুধ, ডিম ও গোশতের সাথে মাছ উৎপাদনও এখন চাহিদার প্রায় দ্বিগুণের কাছে। গত দুই দশকে দক্ষিণাঞ্চলে মাছের উৎপাদন প্রায় ৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, ৩ লাখ টন চাহিদার বিপরিতে এখন প্রায় আড়াই লাখ টন উদ্বৃত্তি। মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, গত একদশকে দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১১২%। আর দেশের মোট ইলিশ আহরণের ৬৬.৬৮% আসে বরিশালসহ সন্নিহিত উপকূল এলাকা থেকে।
এ অবস্থাতেই ‘অভায়শ্রম গড়ে তুলি, দেশি মাছে দেশভরি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাদেশের মতো বরিশালেও এবার জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষ বরিশালে মৎস্য র্যালি ও বেল পার্ক সংলগ্ন লেকে মাছের পোনা অবমুক্ততরণ, শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
আন্তর্জাতিক পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষের দৈনন্দিন ৬০ গ্রাম মাছের চাহিদার বিপরিতে আমাদের দেশে তা ইতোমধ্যে প্রায় ৬৪ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপির ৩.৫৭% এবং কৃষিজ জিডিপির ২৫.৩০% মৎস্যখাতের অবদান। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলে এ হার আরো বেশি বলে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। অধিদপ্তরের মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশরও বেশি মানুষ মৎস্য সেক্টর থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ফাও এর ২০১৮ প্রতিবেদন অনুযায়ী মুক্ত ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে তৃতীয় স্থানে এবং বদ্ধ জলাশয়ের মৎস্য উৎপাদনে ৫ম স্থানে রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলও এক্ষেত্রে যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ অঞ্চলের ৪২টি উপজেলার প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর বদ্ধ জলাশয়, ৪ লাখ ২৭ হাজার ৪৮২ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় ছাড়াও প্রায় আড়াই হাজার বেসরকারি মৎস্য খামার, ৫০টির মতো সরকারি-বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারি, ৯২০টি নার্সারি খামার ছাড়াও প্রায় ৯ হাজার চিংড়ি খামার মৎস্য উৎপাদনে ব্যাপক অবদান রাখছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি ফসলের চেয়ে মাছে মুনফা বেশি হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ মাছ চাষে ঝুঁকছে।
তবে ঘূর্ণিঝড় সিডর, মহাশেন, আম্পান, আয়লা, হামুন, বুলবুল ও সিত্রাং এবং তীব্র সঞ্চালনশীল মেঘমালার প্রবল বর্ষণে দক্ষিণাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মাছের ঘের, পুকুর ও দীঘি বার বার প্লবিত হয়ে কোটি কোটি মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। ফলে মৎস্যচাষিরা সর্বসান্ত হচ্ছে বার বার। কৃষি সেক্টরে প্রণোদনাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি চেষ্টা থাকলেও আজ পর্যন্ত মৎস্য সেক্টর এখনো অবহেলিত। এরপরেও এ অঞ্চলের মৎস্যচাষিরা দমে থাকেনি। ৪২টি উপজেলাতেই মাছচাষে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের ১১টি নদ-নদী নিয়ে বিশাল এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে, যা উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথেষ্ঠ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীগণের সুপারিশে সমুদ্রে যাবার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় ইলিশপোনা-জাটকা বিচরণ করে, খাদ্য গ্রহণসহ বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারি ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়েছে। ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত ১শ কিলোমিটার, মদনপুর থেকে চর ইলিশা হয়ে চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনার শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার, ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালী চর রুস্তম পর্যন্ত তেতুুলিয়া নদীর ১শ কিলোমিটার, খেপুপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার, নড়িয়া থেকে ভেদরগঞ্জ নিম্ন পদ্মার ১২০ কিলোমিটার এবং হিজলা ও মেহদিগঞ্জের লতা, নয়া ভাঙ্গনী ও ধর্মগঞ্জ নদীর মিলনস্থলের ৬০ কিলোমিটারসহ মোট ৬টি অভয়াশ্রমে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করায় উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র এবং মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘœ রাখাসহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুত এবং জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করতে হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা’ বা ‘মেরিন রিজার্ভ এরিয়া’ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব বিজ্ঞান ভিত্তিক কর্মপদ্ধতি দক্ষিণাঞ্চলসহ সারাদেশের মৎস্য সম্পদকেই সমৃদ্ধ করছে।
তবে অব্যাহত নগরায়নের ফলে বরিশাল মহানগরীসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ও উপজেলা শহরগুলোর পুকুর, দীঘি এবং খালগুলো ক্রমাগত ভড়াট হয়ে যাওয়ায় মৎস্য সেক্টরের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। এরপরেও বরিশালসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৪ লাখ ২৭ হাজার পুুকুর ও দীঘি, ৬৬৭টি বরোপীট, ৯০টি প্রবাহমান নদ-নদী, ৪৩টি বিল, একটি বাঁওর বা মরা নদী, প্রায় দেড় হাজার খালসহ সোয়া ৬শ প্লাবন ভূমি নিয়ে সর্বমোট ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরে কম-বেশি মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এসব বদ্ধ ও মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ২০২১-২২ অর্থ বছরে প্রায় ৫ লাখ ৩২ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। যা ইতোমধ্যে সাড়ে ৫ লাখ টন অতিক্রম করেছে। এরমধ্যে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার টনের মতো। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেশে ইলিশের সহনীয় আহরণ ছিল প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন। দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৬০ হাজার টন রুই জাতীয় মাছ এবং পাঙ্গাস, শিং-মাগুর, কৈ, তেলাপিয়া এবং চিংড়ি ছাড়াও অন্যান্য মাছের উৎপাদনও ছিল দেড় লাখ টনের মতো।
বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ৫ লাখ জেলে মৎস্য সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩ লাখ ২ হাজার ৪৭৪। অধিদপ্তরের মতে, এ অঞ্চলে জেলে পরিবারের সংখ্যা আড়াই লাখের মতো। মৎস্য অধিদপ্তরের অপর এক পরিসংখ্যানে দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগেই প্রায় সাড়ে ৩ লাখ জেলে ইলিশ আহরণে জড়িত। যার ৬৫% সার্বক্ষণিক ও ৩৫% খ-কালীন বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।
সরকার ২০১২-১৩ অর্থ বছরকে ভিত্তি হিসেবে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশের মৎস্য চাষি ও মৎস্যজীবীদের আয় ২০% বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এলক্ষ্যে দক্ষিণাঞ্চলেও বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। দেশের বিভিন্ন উন্মূক্ত জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ কার্যক্রম অতীতে যথেষ্ঠ জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও অতি সম্প্রতি তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার খাঁচায় ১২শ মৎস্যজীবী মাছ চাষ করে বছরে প্রায় এক হাজার টন বিভিন্ন ধরনের মিঠা পানির মাছ উৎপাদন করছে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কাকড়া ও কুচিয়া চাষ যথেষ্ঠ সম্প্রসারণ ঘটছে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৩ হাজার টন কুচিয়া ও সাড়ে ৭শ খামারে ৩শ টন কাকড়া উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। ৬টি জেলার ১১টি উপজেলায় পুকুরে কিশোর কাকড়া চাষ, পেনে কাকড়া মোটাতাজাকরণ, খাঁচায় কাকড়া মোটাতাজাকরণ ও সামাজিক পর্যায়ে কুচিয়া চাষ-এর ২৫টি প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হয়েছে। এসব খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া ইতোমধ্যে রপ্তানি বাজারেও প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য সেক্টর নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে আলাপ করা হলে তারা জানান, নদ-নদী বহুল দক্ষিণাঞ্চলে মাছ চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি উন্নত প্রযুক্তিতে মাছচাষ সম্প্রসারণে। এলক্ষ্যে মাছ চাষে সাধারণ মানুষকে আগ্রহী করে তোলাসহ সব মৎস্যচাষিকে উন্নত প্রযুক্তিতে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব
