ইকবাল হোসেন২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯: ০০

একসময় অটোররিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম (৩৫)। আট বছর আগে চাচার সহযোগিতায় এলাকায় মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। এখন তাঁর রয়েছে ৩০০ একরের মাছের খামার। সব খরচ বাদ দিয়ে মাছের খামার থেকে এখন তাঁর বছরে আয় প্রায় তিন কোটি টাকা।
তৌহিদুল ইসলামের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নে। শুধু তিনি নন, কেবল মাছ চাষ করেই তাঁর মতো কোটিপতি হয়েছেন এই ইউনিয়নের শতাধিক মানুষ।
প্রায় ২০ হাজার মানুষের এই ইউনিয়নে একসময় পশুপালন, ধান চাষ ও খাল-বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বাসিন্দারা। তিন দশকের ব্যবধানে বাণিজ্যিক মাছ চাষ বদলে দিয়েছে বাসিন্দাদের জীবন। এখন ইউনিয়নটির প্রায় সাত হাজার মানুষ মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় চাষিরা শুধু নিজেদের এলাকায় নন, আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও মাছ চাষ সম্প্রসারণ করছেন।
সম্প্রতি ওসমানপুর ইউনিয়নের মুহুরী নদী এলাকা, পশ্চিম বাঁশখালী ও পাতাকোট ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে মাছের খামার। কোথাও শ্রমিকেরা খামারে মাছকে খাবার দিচ্ছেন, কোথাও চলছে মাছ ধরার প্রস্তুতি।
জানা গেল ভোর থেকে ওসমানপুর ইউনিয়নের এসব খামারে মাছের পোনা, খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ পরিবহনে ব্যস্ত থাকে শত শত গাড়ি। দিনভর শ্রমিকেরা মাছের খাবার দেওয়া, ওষুধ প্রয়োগ ও পরিচর্যার কাজ করেন। সন্ধ্যার পরই মূলত শুরু হয় মাছ ধরার প্রস্তুতি। রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে জীবন্ত মাছ নিয়ে বিভিন্ন শহরের আড়তের উদ্দেশে রওনা হয় মাছবোঝাই গাড়ি। বছরজুড়েই চলে মাছ উৎপাদন ও বিপণনের এই কর্মযজ্ঞ।
ভোর থেকে ওসমানপুর ইউনিয়নের এসব খামারে মাছের পোনা, খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ পরিবহনে ব্যস্ত থাকে শত শত গাড়ি। দিনভর শ্রমিকেরা মাছের খাবার দেওয়া, ওষুধ প্রয়োগ ও পরিচর্যার কাজ করেন। সন্ধ্যার পরই মূলত শুরু হয় মাছ ধরার প্রস্তুতি। রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে জীবন্ত মাছ নিয়ে বিভিন্ন শহরের আড়তের উদ্দেশে রওনা হয় মাছবোঝাই গাড়ি।
যেভাবে শুরু মাছ চাষ
স্থানীয় মাছচাষি ও উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্র ও মুহুরী নদীর পাশে হওয়ায় ওসমানপুর ইউনিয়ন একসময় দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ছিল। বাসিন্দাদের জীবিকার অন্যতম উৎস ছিল চরাঞ্চলে পশুপালন, কৃষিকাজ ও উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরা। ১৯৮৬ সালে মুহুরী প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রকল্প এলাকার পূর্ব পাশে বিস্তীর্ণ নতুন চর জেগে ওঠে। নব্বইয়ের দশকে সেই চরে খামার তৈরি করে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু করেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের সাফল্য দেখে পরে আরও অনেকে এ ব্যবসায় যুক্ত হন।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয় ও স্থানীয় চাষিদের হিসাবে, বর্তমানে ওসমানপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশখালী, মুহুরী প্রকল্প ও পাতাকোট এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার একর জমিতে মাছের খামার রয়েছে। জায়গার সংকটের কারণে ইউনিয়নটির চাষিরা নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাট ও সুবর্ণচর, ফেনীর সোনাগাজী ও ছাগলনাইয়া এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী, হালিশহর, সীতাকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া ও ইছাখালীর চরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাছ চাষ করছেন। মিরসরাইসহ বিভিন্ন উপজেলায় তাঁদের মাছের খামারের মোট আয়তন প্রায় ৪০ হাজার একর। এসব খামারে বছরে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন কার্প–জাতীয় মাছ উৎপাদিত হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে এ অঞ্চলে প্রথম মাছ চাষ শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল খায়ের, মো. মোস্তফা, মোহাম্মদ মনি ও খোকন। পরে কামরুল হোসেন, ফরিদ উদ্দিন, কাউসার হামিদ, মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, ইউনুছ মিয়া, নাঈম উদ্দিন ও আরিফ হোসেনসহ আরও অনেকে এ পেশায় যুক্ত হন।
বলতে দ্বিধা নেই, মাছ চাষ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আগে কোনোমতে জীবন চালানোর পর্যায়ে ছিলাম, এখন কোটি টাকার হিসাব করতে পারি। মাছ চাষের টাকায় নতুন পাকা ঘর করেছি, গরুর খামার করেছি, কিছু জায়গা কিনেছি।
‘কোটিপতি’ মাছচাষিরা যা বলছেন
অটোরিকশার চালকের পেশা ছেড়ে মাছ চাষে যুক্ত হওয়া ওসমানপুরের খামারি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, শুরুতে দেড় একর জমিতে মাছ চাষ করেছিলেন তিনি। আট বছরের মধ্যে তাঁর খামারের আয়তন দাঁড়ায় ৩০০ একরে। পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে এখন বছরে তাঁর আয় হয় অন্তত তিন কোটি টাকা। তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই, মাছ চাষ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আগে কোনোমতে জীবন চালানোর পর্যায়ে ছিলাম, এখন কোটি টাকার হিসাব করতে পারি। মাছ চাষের টাকায় নতুন পাকা ঘর করেছি, গরুর খামার করেছি, কিছু জায়গা কিনেছি।’
তৌহিদুল ইসলাম আরও বলেন, মাছ চাষের কারণে শুধু খামারিরাই লাভবান হননি। খামারের শ্রমিক, গাড়িচালক, মাছের খাদ্য ও ওষুধের দোকান এবং মাছ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এলাকায় মাছ চাষের জায়গা কমে আসায় এখানকার চাষিরা দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও খামার গড়ে তুলছেন। মাছচাষিদের নিরাপত্তা ও ঋণসহায়তা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তৌহিদুলের মতো এলাকার আরেক মাছচাষি মোহাম্মদ ইউনুস মিয়ার (৩৬) বাড়ি ওসমানপুর ইউনিয়নের বাঁশখালী গ্রামে। তাঁর মাছের খামার রয়েছে প্রায় ২০০ একর। খামারে কাজ করেন প্রায় ১৫ জন শ্রমিক।
১০ বছর আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে মাছ চাষ শুরু করেন ইউনুস মিয়া। শুরু হয় সাত একরের মাছের খামার দিয়ে। ইউনুস বলেন, ‘একসময় নিজে স্বল্প বেতনে চাকরি করেছি। এখন আমার মাছের খামারে বছরে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়।’
মাছের খামার ওসমানপুর ইউনিয়নের মানুষের আর্থিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে বলে জানান ইউনুস। তিনি বলেন, ‘এই ইউনিয়নের প্রায় বাড়িতেই এখন পাকা ঘর উঠেছে। এখানে যাঁদের ২০ থেকে ৩০ একর মাছের খামার আছে, তাঁরা সবাই কোটিপতি। এলাকায় ৫০ একরের ওপরে মাছের খামার আছে এমন মানুষের সংখ্যাও কয়েক শ।’

ইউনুস বলেন, ‘এখানকার চাষিদের হাত ধরে মাছ চাষ এখন মিরসরাইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে নোয়াখালী ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ভালো মানের মাছের খাদ্য পাওয়া এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, অনেক কোম্পানির খাদ্যের মান ভালো নয়। আর এখন মাছের খাদ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, সে তুলনায় মাছের দাম বাড়ছে না। এটিও আমাদের জন্য একটা বড় প্রতিবন্ধকতা।’
ইউনিয়নের পাতাকোট এলাকার বাসিন্দা ফরিদুল ইসলাম ছিলেন প্রবাসী। ২০ বছর আগে দেশে ফিরে নিজ এলাকায় স্বল্প পরিসরে মাছ চাষ শুরু করেন। এখন তিনি ৪০০ একর খামারের মালিক। মাছের খামারের পাশাপাশি বড় একটি কোম্পানির ফিশ ফিডের পরিবেশকও তিনি। জানতে চাইলে এই খামারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাছ চাষ আমাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। অর্থ–সম্মান সবই দিয়েছে। আমি নিজেও এখন বছরে মাছ চাষ থেকেই কয়েক কোটি টাকা আয় করি।’ তিনি বলেন, ‘দেশে মিঠাপানির মাছের চাহিদার বড় একটি অংশের এখন জোগান দেওয়া হয় মিরসরাই থেকে। আমরা চাই মাছের খাদ্যের দাম স্থিতিশীল থাকুক আর উৎপাদিত মাছেরও বাজারে ন্যায্যমূল্য থাকুক।’
এই ইউনিয়নের প্রায় বাড়িতেই এখন পাকা ঘর উঠেছে। এখানে যাঁদের ২০ থেকে ৩০ একর মাছের খামার আছে, তাঁরা সবাই কোটিপতি। এলাকায় ৫০ একরের ওপরে মাছের খামার আছে এমন মানুষের সংখ্যাও কয়েক শ।
ওসমানপুরে যত উৎপাদন
মিরসরাই উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, মিরসরাই উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের মাছচাষিরা নিজ এলাকায় ১৫ হাজার একর জায়গায় মাছ চাষ করেন। এর বাইরে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় আরও ২৫ হাজার একর এলাকায় মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা।
তিনি বলেন, ‘এখানকার চাষিরা বিভিন্ন কোম্পানির ভালো মানের ফিড ব্যবহার করেন। উচ্চ ঘনত্বের চাষপদ্ধতি অবলম্বন করায় ওসমানপুর ইউনিয়নের চাষিরা প্রতি একরে ১০ থেকে ১২ টন তেলাপিয়া ও কার্প–জাতীয় মাছ উৎপাদন করতে পারেন। সে হিসাবে মুহুরী প্রকল্প এলাকাতেই প্রতিবছর ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয়। এর বাইরে অন্যান্য উপজেলায় গিয়ে মাছ উৎপাদন তো রয়েছেই।’
ভালো মানের ফিড ব্যবহার করায় মুহুরী প্রকল্প এলাকায় চাষ করা মাছ নিরাপদ ও সুস্বাদু বলেও জানান মিরসরাই উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নানা সময় পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি ওসমানপুর ইউনিয়নে অনেক বড় বড় মাছ চাষি রয়েছেন। মাছ চাষ করে শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন এমন শতাধিক চাষি আছেন সেখানে। আমরা তাঁদের মাছ চাষে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে সব ধরনের সহযোগিতা করে থাকি।’
