মো. জহিরুল ইসলাম-নামটি আজ কুমিল্লার লালমাই উপজেলার আশকামতা গ্রামে একজন পরিশ্রমী ও সফল খামারির প্রতীক। পেশাগতভাবে তিনি একজন গবাদিপশুর খাদ্য বিক্রেতা হলেও, তার পরিচয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে একজন দক্ষ ও সচেতন খামারি হিসেবে গড়ে ওঠার গল্প। সীমিত সম্পদ, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে কীভাবে একজন মানুষ সফল খামারি হতে পারেন-মো. জহিরুল ইসলামের জীবন তারই এক বাস্তব উদাহরণ।
আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে তার খামার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র একটি গরু দিয়ে। সে সময় খামার বলতে বড় কোনো অবকাঠামো বা আর্থিক বিনিয়োগ ছিল না, ছিল শুধু আগ্রহ, ধৈর্য এবং শেখার মানসিকতা। গরু পালনের পাশাপাশি তিনি গবাদিপশুর খাদ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা তাকে পশুখাদ্য সম্পর্কে বাস্তব ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তার খামার ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ধীরে ধীরে একটি গরু থেকে আজ তার খামারে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। তার খামারের সবগুলো গরুই হলেস্ট্রাইন ফ্রিজিয়ান জাতের, যা দুধ উৎপাদনের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। উন্নত জাত নির্বাচনের পাশাপাশি তিনি গরুর স্বাস্থ্য, খাবার ও পরিচর্যার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর ফলেই তার খামার থেকে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ৩-৪টি গরু বিক্রি করতে সক্ষম হচ্ছেন, যা তার পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় বড় ভূমিকা রাখছে।
মো. জহিরুল ইসলামের খামারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারিবারিক অংশগ্রহণ। তিনি ও তার স্ত্রী দু’জন মিলেই খামারের সার্বিক দেখাশোনা করেন। স্ত্রী খামারের দৈনন্দিন পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও গরুর যত্নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। এই পারস্পরিক সহযোগিতা তাদের খামারকে আরও সুসংগঠিত ও টেকসই করে তুলেছে।
খাবারের ক্ষেত্রে তিনি স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। খামারের গরুগুলোর জন্য তিনি তিন কানি জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেন, যা সারা বছর সবুজ ও পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে। এর পাশাপাশি তিনি খর, ভূষি ও চাউলের কুঁড়া খাওয়ান, যা গরুর পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার কারণেই তার গরুগুলো সুস্থ, সবল এবং উৎপাদনক্ষম।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-অসুস্থ গাভীর চিকিৎসা তিনি নিজেই করে থাকেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান এবং বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি গরুর সাধারণ রোগ, টিকা ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করেছেন। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসা খরচ কমে, অন্যদিকে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ায় গরুর মৃত্যুঝুঁকিও কমে আসে।
মো. জহিরুল ইসলামের এই সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অধ্যবসায় ও শেখার আগ্রহ। তিনি নিয়মিতভাবে নতুন তথ্য জানার চেষ্টা করেন, সফল খামারিদের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করেন এবং নিজের খামারে তা প্রয়োগ করেন। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে-সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে অল্প পরিসর থেকেও একটি সফল খামার গড়ে তোলা সম্ভব।
আজ মো. জহিরুল ইসলাম শুধু একজন সফল খামারিই নন, বরং এলাকার অনেক নতুন খামারির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার জীবনকাহিনি আমাদের শেখায়, শুরুটা ছোট হলেও স্বপ্ন বড় হলে এবং চেষ্টা অব্যাহত থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
