নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে যে কয়েকটি সম্পদ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, ইলিশ তার অন্যতম। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা উপকূলীয় মোহনার ঢেউ পেরিয়ে যখন রুপালি শরীরের ইলিশ উজানে ছুটে আসে, তখন সেটি কেবল একটি মাছের যাত্রা নয়; এটি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর জীবনচক্রের অংশ। সেই জীবনচক্রের সফলতার ওপর নির্ভর করে হাজার হাজার জেলে পরিবারের জীবিকা, কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশে কোনো কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে সবার কাছে জনপ্রিয় হয় না। ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞাও তেমন একটি সিদ্ধান্ত। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত আছে লাখো মানুষের জীবিকা। কিন্তু সব সিদ্ধান্তকে বর্তমানের সুবিধা-অসুবিধার মানদণ্ডে বিচার করলে চলে না। কিছু সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিতে হয়। মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচি তেমনই একটি দূরদর্শী উদ্যোগ, যার সুফল আজ নয়; আগামী দিনের বাংলাদেশ ভোগ করবে।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। কিন্তু এর গুরুত্ব কেবল জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১১-১২ শতাংশ আসে এই একক প্রজাতি থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যান কেবল উৎপাদনের হিসাব নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার গল্প। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত এবং প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইলিশ নির্ভর। কিন্তু প্রকৃতি তার সম্পদকে অনন্তকাল ধরে অবাধে বিলিয়ে দেয় না। প্রকৃতিরও কিছু নিয়ম আছে। ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে আসে ডিম ছাড়ার জন্য। এই প্রজননকালেই যদি নির্বিচারে মাছ ধরা হয়, তবে একটি প্রজন্ম জন্ম নেওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে কয়েক বছর পর উৎপাদন কমে আসে, জেলেদের আয় কমে যায়, বাজারে সংকট তৈরি হয় এবং একটি জাতীয় সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
একসময় বাংলাদেশও সেই আশঙ্কার মুখোমুখি হয়েছিল। অতিরিক্ত আহরণ, জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে ইলিশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, দেশের নদীগুলো হয়তো একদিন ইলিশশূন্য হয়ে পড়বে। কিন্তু সময়মতো নেওয়া কিছু নীতিগত পদক্ষেপ সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।
তবে সাফল্যের গল্প শুনে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদনে কিছুটা ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে নদীদূষণ, নাব্য সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত আহরণ এবং আবাসস্থলের পরিবর্তনকে দায়ী করছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানকে অনেকেই কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এটি সামাজিক অংশগ্রহণেরও একটি পরীক্ষা। প্রশাসন নদীতে অভিযান চালাতে পারে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি করতে পারে, কিন্তু সমাজের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের কর্মসূচি পুরোপুরি সফল হওয়া সম্ভব নয়।
একজন ভোক্তা যদি নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ কিনতে অস্বীকৃতি জানান, একজন ব্যবসায়ী যদি অবৈধভাবে ধরা মাছ বাজারজাত না করেন এবং স্থানীয় জনগণ যদি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান গ্রহণ করেন, তাহলে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। বাজারে চাহিদা থাকলে অবৈধ সরবরাহের পথও খোলা থাকে। তাই দায়িত্ব শুধু জেলেদের নয়; দায়িত্ব আমাদের সবার।
সরকার নিবন্ধিত জেলেদের জন্য খাদ্যশস্য সহায়তা এবং ভিজিএফ কর্মসূচির ব্যবস্থা করেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলে পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয় এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সব সময় নীতিপত্রের মতো নিখুঁত হয় না। অনেক সময় প্রকৃত জেলে তালিকাভুক্ত হন না, আবার কোথাও কোথাও সহায়তা বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
বাংলাদেশের নদীগুলো একসময় ছিল প্রাণবন্ত ও প্রবহমান। আজ অনেক নদী সংকুচিত, দূষিত কিংবা মৃতপ্রায়। ইলিশ সংরক্ষণ তাই কেবল মৎস্য ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নেরও প্রশ্ন। বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত আহরণের কারণে বহু মাছের প্রজাতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা এখনো সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পেরেছি। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে আসে এবং এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করতে হবে।
ইলিশ এখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য। এটি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচয়েরও একটি অংশ। যে সম্পদকে আমরা বিশ্বের কাছে নিজেদের গর্ব হিসেবে তুলে ধরি, সেই সম্পদের সুরক্ষায় উদাসীন হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রকৃতি আমাদের বারবার একটি শিক্ষা দেয় সংযমের মধ্যেই টেকসই সমৃদ্ধির বীজ নিহিত থাকে। আমরা যদি সাময়িক লাভের জন্য প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নিধন করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা নিঃস্ব করে যাব। কিন্তু যদি কয়েক দিনের জন্য সংযম দেখাতে পারি, তবে সেই সংযমই আগামী বছরের প্রাচুর্যের ভিত্তি তৈরি করবে।
২২ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা তাই কোনো বাধা নয়, বরং একটি বিনিয়োগ। এটি বর্তমানের সামান্য ত্যাগের বিনিময়ে ভবিষ্যতের বড় অর্জনের প্রস্তুতি। এটি কেবল মাছ সংরক্ষণের কর্মসূচি নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার একটি বাস্তব উদাহরণ।
বাংলাদেশের নদীগুলোতে যখন নিরাপদে ডিম ছাড়বে মা ইলিশ, তখন শুধু নতুন মাছের জন্ম হবে না; জন্ম নেবে নতুন সম্ভাবনাও। জেলের জালে ফিরবে প্রাচুর্য, বাজারে ফিরবে সরবরাহ, অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন গতি। আর সেই কারণেই মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানকে কেবল সরকারি কর্মসূচি হিসেবে নয়, জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।
আজকের সংযমই আগামী দিনের সমৃদ্ধি। ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা মানে একটি মাছকে রক্ষা করা নয়; বরং নদী, প্রকৃতি, জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। বাংলাদেশের রুপালি ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই সত্য আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে ইলিশের নিরাপদ প্রজনন, সংযমেই সমৃদ্ধির পথ।
লেখক: সাংবাদিক।
