এক সময় নেদারল্যান্ডে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা বেশ প্রচলিত ছিল। কেননা এভাবে মাছ ধরলে জালে কোনো অপ্রয়োজনীয় জিনিস আটকে থাকে না। তা ছাড়া সাগরে যারা মাছ শিকার করতে যান, তাদের জন্য একটি অসুবিধা হলো জালটি সাগরের তলদেশে কোথাও আটকে যায়। কিন্তু শক দিয়ে মাছ শিকার করলে জাল আটকে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এটাকে ‘পালস ফিশিং’ বলা হয়। তারা পানিকে ইলেকট্রোড অর্থাৎ একটা বৈদ্যুতিক লাঠি ডুবিয়ে দিত। তারপর তা দিয়ে মাছের গায়ে শক দিত। এতে মাছ ভেসে উঠত। কিন্তু ইউরোপের পরিবেশবাদীরা এর বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, এতে মাছের সংখ্যা ও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। শুধু পরিবেশবাদীরা নন, সেখানকার জেলেরাও এর প্রতিবাদ করেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ফ্রান্সের সড়ক অবরোধ করে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ মারার প্রতিবাদ জানান জেলেরা। নেদারল্যান্ডে পরে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি পত্রিকা ইলেকট্রিক শক দিয়েমাছ শিকার করার সংবাদ প্রকাশ করেছে। চলতি বছরে গত ২ মার্চ দেশ রূপান্তর পত্রিকাতেও এমন একটি খবর প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয় বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীতে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। অসাধু জেলেরা রাতের আঁধারে এভাবে মাছ মারেন। অনেক সময় দিনের আলোতেও তারা ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকার করেন। এই কাজটি তারা করেন গোপনে। এর জন্য তারা কয়েকটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি ব্যবহার করেন। ব্যাটারিগুলো নৌকায় রেখে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বৈদ্যুতিক শক দেন। এতে করে শকপ্রাপ্ত এলাকার মাছ ধীরে ধীরে পানিতে ভেসে ওঠে। পরে অসাধু জেলেরা জাল দিয়ে সেসব মাছ সংগ্রহ করেন। সেই জেলেরা এভাবে মাছ সংগ্রহ করে সারিয়াকান্দির যুমনাপাড়ার আড়ৎ ও বগুড়ার অন্যান্য আড়তে বিক্রি করেন। সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ফলে মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে। রেণু পোনা মারা যাচ্ছে।স্থানীয়দের মতে, এই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ফলে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় এক জেলের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জেলেরা এই পদ্ধতির দিকে বেশি ঝোঁকার কারণ, কম সময়ে বেশি মাছ পাওয়া যায়। যেসব নদীর নাব্যতা কম থাকে, বৈদ্যুতিক শক সেসব নদীর তল পর্যন্ত পৌঁছায় বলে অনেক মাছ ধরা যায়। যমুনা নদীর ক্ষেত্রে সেই বিষয়টিই ঘটছে। তারা ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ব্যবহার করছেন, লোহার রড আর বড় বড় শক্ত বাঁশ ব্যবহার করে মাছ শিকার করছেন। এই পদ্ধতিতে ১০ থেকে ১২ মিনিট শক দেন। পরে ৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই দেখা যায়, অনেক মাছ ভেসে উঠছে। এভাবে মাছ শিকার করলে শুধু মাছ নয়, অন্যান্য শামুক, জোঁক, সাপসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদও ভেসে ওঠে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। ২০২৪ সালের ২৯ মার্চে প্রকাশিত অন্য একটি দৈনিক পত্রিকাতেও এমন মাছ ধরার খবর প্রকাশ হয়েছিল। সেই খবর অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বারাশিয়া নদী ও মধুমতী বাঁওড়সহ নদীনালা, খালবিলে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। এই খবরে স্থানীয় সাধারণ জেলেরা কিছু অভিযোগ করেন। যেমন : বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ফলে নদী, খাল ও বাঁওড়ে থাকা মাছের পোনা, ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। এতে করে অন্যান্য জেলে আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। সাধারণ জেলেরা মাছ না পেয়ে, অনেকেইএই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত একটি সংবাদে জানা যাচ্ছে, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীতেও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই, ঝাড়সিংহেশ্বর, দোহলপাড়া, তেলিরবাজারসহ অনেক জায়গায় এভাবে শক দিয়ে মাছ মারা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করলে মাছের প্রজনন চক্র ব্যাহত হয়। রেণু মাছসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির দিকে যায়। বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ মারলে, জলজ প্রাণীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ে। কেননা এতে মাছের উৎপাদন হ্রাস পায়। এভাবে মাছ শিকার করার ফলে সাধারণ জেলেদের জালে আর তেমন মাছ ধরা পড়ে না। ফলে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। একপর্যায়ে তারা এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করা হলে, অনেক সময় মানুষই বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যেতে পারে। এমন কিছু মৃত্যুর সংবাদও জানা গেছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এ ছাড়া এমন পদ্ধতির ফলে বাস্তুতন্ত্রের ওপর বড় প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাছের প্রজনন। বাংলাদেশে মাছ ধরতে, জেলেরা এখন প্রাচীন পদ্ধতি আর ব্যবহার করছেন না। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের খবরও। জেলেরা এক ধরনের অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বা গ্যাস ট্যাবলেট দিয়ে মাছ শিকার করছে। এই ট্যাবলেট অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা এই ট্যাবলেট পানিতে ফেললে, জলে থাকা সব মাছ তো মারা যায়ই, সঙ্গে সঙ্গে মাটির নিচের অন্য প্রাণীগুলোও মারা যায়। তবু এক শ্রেণির জেলে, এই পদ্ধতিতেই মাছ ধরছেন। কেননা, এতে সময় অনেক কম এবং মাছ বেশি পাওয়া যায়। পরিশ্রমও কম হচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় তারা ভাবছেন না যে, এতে করে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্যের পুরোটাই ধ্বংস হয়ে যায়। কাজেই এভাবে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে মৎস্য বিভাগ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর অভিযান চালানো উচিত। সাধারণ অভিযান যে চালানো হয় না, তা নয়। একটি নিউজ পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ জুলাই ২০২৫ সালে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেঘনা ও কোদালকাটি এলাকার ফেরিঘাট, পাওয়ার হাউজ, কোদালকাটি নদীর পয়েন্ট, রাজাকাটা, শিমুলকান্দি, ইমামেরচর, তেয়ারিচরসহ বিভিন্ন স্পটে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় তারা বৈদ্যুতিক শকের যন্ত্রপাতিসহ দুজন জেলেকে আটক করেন। এভাবে নানা সময়ে অসাধু জেলেরা আটক হচ্ছেন। অভিযানও বিভিন্ন সময়ে চালানো হচ্ছে।বাংলাদেশে মৎস্য আইন লঙ্ঘন করলে প্রথমবার আইন ভঙ্গকারীর শাস্তি হবে কমপক্ষে ১ মাস হতে সর্বোচ্চ ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর সঙ্গে ১০০০ টাকা জরিমানা। পরবর্তী প্রতিবার আইন ভঙ্গের জন্য কমপক্ষে ২ মাস হতে সর্বোচ্চ ১ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা জরিমানা। মৎস্য সংরক্ষণ আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অভ্যন্তরীণ বা সামুদ্রিক জলাশয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য, বন্দুক, ধনুক এবং তীর দ্বারা মৎস্য নিধন করতে বা এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবেন না। ৬ ধারায় বলা হয়েছে ‘কোনো ব্যক্তি পানিতে বিষ প্রয়োগ করলে বা কল কারখানার বর্জ্য পদার্থ নিক্ষেপ করলে বা অন্য কোনো উপায়ে পানি দূষিত করতে বা এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে না।’ বাংলাদেশে কারেন্ট জাল, জাপানি কারেন্ট জাল, ফান্দি জাল, কাঁপা জাল, বাঁধা জাল, কাঠি জাল ইত্যাদি নামে পরিচিত। এস. আর, ও ২৪ আইন/৮৮-মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫-এর ধারা ১২ অনুযায়ী, মাছ ধরার ক্ষেত্রে ৪.৫ সেন্টিমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাস বা দৈর্ঘ্যরে ফাঁস বিশিষ্ট জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এক তন্তু বিশিষ্ট নাইলনের সব প্রকার জাল অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সব প্রকার কারেন্ট জাল উৎপাদন, বুনন, আমদানি, বিপণন, গুদামজাতকরণ, বহন, পরিবহন নিজের আয়ত্তে রাখা বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের কারেন্ট জাল উৎপাদন, বুনন, আমদানি, বাজারজাতকরণ অথবা গুদামজাতকরণ করলে তিন থেকে চার বছরের জেল ও এক হাজার টাকা বা পাঁচ হাজার পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আমাদের মাছে ভাতে বাঙালি বলা হতো। অর্থাৎ ভাত যেমন আছে, তেমনি মাছও পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। তবে এটা সব মাছের ক্ষেত্রে হয়তো নয়। সব সময়ের জন্য হয়তো নয়।
মাছের উৎপাদন বাংলাদেশে একেবারে কম নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর মতে, মুক্ত জলাশয়ে স্বাদু পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর মুক্ত জলাশয়ের স্বাদু পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। এ ছাড়া ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রথম আর তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও-প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ মিঠা পানির মাছ আহরণে বিশ্বে
দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন। হাওর-বাঁওড়, খাল-বিলে দেশি মাছের প্রজনন মৌসুমে সুরক্ষা দিতে পারলে এর উৎপাদন আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মৎস্য খাতে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ জড়িত। এর মধ্যে ১৪ লাখ নারীও রয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় অনেক মাছ আবার দেখা যাচ্ছে। পুকুরে মাছ চাষ এই উৎপাদনকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে ৫৬ শতাংশ মাছ আসছে পুকুরের মাছ চাষ থেকে। নদী, নালা, খাল-বিলেও নানাভাবে মাছ চাষ হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়কে কীভাবে আরও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। কিছু অসাধু জেলের কারণে মাছ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে না। তাই এ ধরনের জেলেদের কারেন্ট জাল ব্যবহার, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ আহরণের মতো কর্মকা- কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। যাতে করে, মৎস্য প্রজননে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। যদি তা করা সম্ভব হয়, তাহলে মাছের উৎপাদন অনেক বাড়বে। মৎস্য খাতে জড়িত মানুষের আয়ও বাড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছেও বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মূল্য, সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
সূত্র: দেশ রূপান্তর
