‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি আবার আলোচনায় আসতে চলেছে। কারণ দেশের বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিলুপ্তপ্রায় ৬৪ প্রজাতির মাছের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৪০ প্রজাতির মাছকে ফিরিয়ে এনেছে। আগুনচোখা বা আংগুস মাছ এগুলোর অন্যতমপটুয়াখালী জেলার আগুনমুখা নদীর নাম আমাদের অনেকের জানা। কিন্তু ‘আগুনচোখা’ মাছের নাম আমরা কজনেই বা জানি। এটি মিঠাপানির একটি সুস্বাদু মাছের প্রজাতির নাম। অঞ্চলভেদে এ মাছটিকে আংগুস, আংরোট বা কারসা নামেও ডাকা হয়।
বৈজ্ঞানিক নাম Labeo angra. এটি Cyprinidae পরিবারের কার্প জাতীয় মাছ। ‘গণ’ নাম ‘Labeo’ এসেছে লাতিন শব্দ ‘labeo’ থেকে, যার অর্থ ‘লম্বা ঠোঁটওয়ালা’। মাছটির ঠোঁটের পুরু ও মাংসল বৈশিষ্ট্য দেখে এমন লাতিন শব্দটি বেছে নেওয়া হয়েছে। আর ‘প্রজাতি’ নামটি আঞ্চলিক, বিশেষত বাংলা ভাষার ‘আঙরা’ শব্দ থেকে গৃহীত।
নদ-নদীর প্রবহমান জলাশয় এদের আবাসস্থল। বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, ভারত, মায়ানমার, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে এ মাছটি পাওয়া যায়। দেশে একসময় এ মাছটি ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে প্রচুর পাওয়া যেত। উত্তরবঙ্গের হাটবাজারে এ মাছটি এখন কদাচিৎ চোখে পড়ে।
এ মাছের দেহ লালচে বাদামি। দেহের মধ্যভাগে কালো দাগ থাকে। এ মাছের পৃষ্ঠদেশ উদরীয় অংশ তুলনায় কিছুটা উত্তল। ঠোঁট চোয়ালের তুলনায় বিস্তৃত।এটি মূলত উত্তরবঙ্গের তিস্তা নদীর মাছ হিসেবেই এখন অধিক পরিচিত।
তবে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্টিগুণসম্পন্ন এ মাছটি। ফলে অনেকেই বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এ মাছের নামও জানে না। জলদূষণ, অতি আহরণ এবং প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত ও বিনষ্ট হওয়ায় এ মাছটি এখন বিপদাপন্ন। তবে আশার কথা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা তিস্তা, চিকলী, ডেপা এবং আত্রাই নদী থেকে ২০১৮ সালে দুষ্প্রাপ্য এ মাছ সংগ্রহ করে গবেষণার মাধ্যমে ২০২০ সালে দেশে প্রথম এই মাছটির কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন। ফলে পুকুরে চাষ এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে এর পোনা অবমুক্তির মাধ্যমে আগুনচোখা মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে এবং খাবার পাতে আবার ফিরিয়ে আনা যাবে। চাষাবাদের ক্ষেত্রে আগুনচোখা মাছ বর্তমানে এক নতুন সম্ভাবনা। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহ কেন্দ্রের লাইভ জিন ব্যাংকেও এ মাছটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রকৃতিতে কোনো কারণে এ মাছটি হারিয়ে গেলে কিংবা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তখন লাইভ জিন ব্যাংকের মাছ থেকে হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
আমাদের দেশের মিঠাপানির ২৬১ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩টি হচ্ছে ছোট প্রজাতির মাছ। আগুনচোখা হলো ছোট প্রজাতির একটি মাছ। ওজনে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে; ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম ওজনের হলেই পরিপক্ব ও প্রজননক্ষম হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি স্ত্রী মাছ ২০ থেকে ৫০ হাজারটি ডিম ধারণ করতে পারে। দেখতে সুন্দর এ মাছটির প্রজননকাল মে থেকে আগস্ট; তবে জুন-জুলাই সর্বোচ্চ প্রজননকাল। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী মাছ পুরুষের চেয়ে আকারে বড় হয়।
উল্লেখ্য, দেশের বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে এরই মধ্যে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিলুপ্তপ্রায় ৬৪ প্রজাতির মাছের মধ্যে এ প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৪০ প্রজাতির মাছকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
নীলফামারী জেলায় বর্তমানে এ মাছটির পরীক্ষামূলক চাষাবাদ শুরু হয়েছে। রুই জাতীয় মাছের সঙ্গে মিশ্র চাষ করা যায়। এ মাছটি সর্বভুক স্বভাবের এবং চাষাবাদে সম্পূরক খাদ্য গ্রহণ করে। পর্যায়ক্রমে মাছটির আবাদ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া গেলে ভোক্তারা এর স্বাদ ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারবে। স্বাদ, পুষ্টিমান ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় আগুনচোখা মাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। খরাপ্রবণ এলাকায় অন্যান্য মাছের সঙ্গে এ মাছের চাষ করা যায়। আগুনচোখা মাছ দ্রুত বাড়ে এবং চাষাবাদে তিন থেকে চার মাসে মাছটি বাজারজাত যোগ্য হয়ে ওঠে। বাজারে পাঁচ শ থেকে ছয় শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
