প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আশির দশকে গ্রামের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন শেখ রফি আহমেদ আচ্চু। গাইবান্ধার যমুনা নদীর ফুলছড়ি ঘাট থেকে ট্রেনে পাতিলে করে মাছের রেণু নিয়ে আসতেন। রাস্তার এ ঝক্কি থেকে মুক্তি পেতে কয়েক বছর পর নিজেই বাড়ির পাশে গড়ে তোলেন হ্যাচারি। রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছের ডিম থেকে রেণু উৎপাদন শুরু করেন।
তাঁর সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে তালসন গ্রাম থেকে ছড়িয়ে পড়ে রেণু উৎপাদন ও মাছ চাষ। নব্বইয়ের দশকে গড়ে ওঠে আরও বেশ কিছু হ্যাচারি। অধিক লাভজনক হওয়ায় পতিত জলাশয় ভরে ওঠে মাছে, খনন করা হয় নতুন নতুন পুকুর। এভাবেই বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় শুরু হয় মাছ চাষের এক নীরব বিপ্লব।
বর্তমানে আদমদীঘি দেশের সবচেয়ে বড় রেণু উৎপাদনের কেন্দ্র। এখানেই উৎপাদিত হয় দেশের সর্বাধিক পাঙাশের রেণু। এখান থেকে বছরে রেণু, পোনা ও বড় মাছ বিক্রির পরিমাণ ৪২৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার মানুষের। এটিই এখন স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, আদমদীঘিতে সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ছয় হাজার ৪৭২টি জলাশয় রয়েছে। সরকার নিবন্ধিত হ্যাচারি ৬০টি। এগুলোয় পাবদা, ট্যাংরা, শিং, পাঙাশ, গুলসাসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের রেণু উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু পাঙাশের রেণু ও পোনা উৎপাদন হয় বছরে ৩০০ কোটি টাকার ওপরে। আর অন্যান্য রেণু ও পোনা উৎপাদিত হয় ১৫-২০ কোটি টাকার।
এ ছাড়া বছরে নানা প্রজাতির মাছ বিক্রি হয় প্রায় ১১০ কোটি টাকার।
চাষিরা বলছেন, উপজেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি টাকার পাঙাশের রেণু বিক্রি হয়। অন্যান্য মাছের রেণু ও পোনা বিক্রির হিসাব কষলে এই পরিমাণ বছরে ৪২৫ কোটি টাকারও বেশি।
আদমদীঘিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ জানায়, মাটির গুণাগুণের কারণে এই উপজেলায় পাঙাশের রেণু সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়। দেশে পাঙাশের রেণুর ৬৫ ভাগই উৎপাদন হয় আদমদীঘিতে। দিন দিন এর চাহিদা আরও বাড়ছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সারাদেশে পাঙাশের রেণু ও পোনা বিক্রি হয়েছে ৪৮৫ কোটি টাকার। এর মধ্যে শুধু আদমদীঘিতে থেকেই ৩১১ কোটি টাকার। পরের অর্থবছরে সারাদেশে ৪৯২ কোটি টাকার মধ্যে এ উপজেলা থেকে ৩১৭ কোটি টাকার রেণু বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সারাদেশের ৪৮০ কোটি টাকার মধ্যে আদমদীঘি থেকে রেণু ও পোনা বিক্রি হয়েছে ৩১২ কোটি টাকার।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা নাহিদ হোসেন বলেন, এখানকার রেণু-পোনা ও বড় মাছের বাজার অন্তত ৪২৫ কোটি টাকার। তথ্যমতে, আচ্চুসহ তিনজন এ উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ ও রেণু পোনার চাষাবাদ প্রথম শুরু করেন।
শুধু রেণু পোনাই নয়, আদমদীঘির গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জলাশয়ে চাষ হচ্ছে মাছ। জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আদমদীঘি থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হয় ১১০ কোটি টাকার ওপরে। রেণু পোনা ও বড় মাছ ঘিরে কর্মসংস্থান হয়েছে ২২ হাজার মানুষের।
স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান
মাছ চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আদমদীঘির অন্তত অর্ধলাখ মানুষ জড়িত। প্রায় প্রতিটি পরিবারের যুবকরা এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি, আবার কেউ পড়াশোনা শেষে এ খাতকে বেছে নিয়েছেন জীবিকার পথ হিসেবে। ফলে তারা শুধু নিজেদের পরিবারের ভরসাই নন, বরং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
নসরতপুর এলাকার যুবক গোলাম রসুলও তাদের একজন। তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। স্নাতক শেষ করে গোলাম রসুল নিজেও দুটি পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেছেন। পাশাপাশি তিনি একটি হ্যাচারি গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে এখান থেকে আসা আয় দিয়ে পরিবার নিয়ে বেশ সুখেই আছেন বলে জানালেন।
গোলাম রসুল বলেন, আমার মতো উপজেলার বিপুলসংখ্যক যুবক এখন চাকরির পেছনে না ছুটে মাছ চাষ করে ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। অনেকে আবার অন্যের পুকুর কিংবা হ্যাচারিতে কাজ করছেন।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক ড. রায়হান ইসলাম বলেন, আদমদীঘিতে মাছ চাষে এক বৈপ্লবিক যুগের সূত্রপাত ঘটেছে। উপজেলার হাজার হাজার অক্ষরজ্ঞানহীন ও উচ্চ শিক্ষিত যুবক মাছ চাষের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থান করে নিয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতেও তারা ব্যাপক অবদান রাখছেন।
মাছ চাষকে কেন্দ্র করে উপজেলা সদরে মাছ ও রেণু পোনা বেচাকেনার মোকাম গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারিভাবে চাষিদের নিয়ে উপজেলায় মৎস্য উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি নামে একটি সংগঠন করা হয়েছে। এর সদস্য সংখ্যা সাড়ে সাত শতাধিক।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কোরবান আলী বলেন, পাঙাশ মাছের রেণুর জন্য দেশের মধ্যে আদমদীঘি বিখ্যাত। এখানের রেণু-পোনা দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। গত এক দশক ধরে পাঙাশের রেণু বিভিন্ন মাধ্যমে ভারতেও যাচ্ছে।
ভারতে পাঙাশ মাছের রেণুর ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বৈধপথে পাঠানোর সুযোগ কম বলে জানালেন ‘আয়শা হ্যাচারি’র মালিক জিয়াউল হক পুটু। আদমদীঘি এলাকায় তাঁর হ্যাচারিতে প্রতি বছর ১৫ কোটি টাকার শুধু পাঙাশের রেণু ও পোনা উৎপাদিত হচ্ছে। তিনি বলেন, মাছের রেণু রপ্তানির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যেন ভারতে বৈধভাবে রপ্তানি করা যায়। তাহলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সুফল পাবে। আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিও তুলে ধরেন জিয়াউল। তিনি বলেন, মাছের খাবার ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি আমাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। অভাব রয়েছে সরকারি সহায়তারও। সরকার এগিয়ে এলে এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।
বর্তমানে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মহিত তালুকদার উপজেলার মধ্যে বৃহত্তম মাছের খামার গড়ে তুলেছেন। জিএম এ্যাকোয়া কালচার নামে তাঁর খামারটিতে ৫০ একরের জলাশয় রয়েছে। সেখানে কাজ করছেন শতাধিক যুবক। আবদুল মহিত জানান, তিনি শুধু রেণু নয়, দুটি খামারে নানা প্রজাতির মাছের চাষ করেন। তাঁর খামারের মাছ দেশের ৩৪টি জেলায় যায়, বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ গড়ে ২৫ কোটি টাকা।
উপজেলার শাওয়াল গ্রামের প্রবীণ মৎস্যচাষি রঘুনাথ মাঝি বর্তমানে বয়সের ভারে শয্যাশায়ী। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, পূর্বপুরুষরা খালে বিলে নদীতে মাছ ধরেই জীবিকা চালিয়েছেন। আমরাও এ পেশার সঙ্গেই ছিলাম। সে সময় কেউ বাণিজ্যিকভাবে মাছের চাষ করেনি। আশির দশকে আচ্চু প্রথম মনমতো সরকার ও মোজাম্মেল হককে নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছিলেন। তাদের দেখাদেখি পুরো উপজেলায় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মাছ এবং রেণু-পোনার ব্যবসা।
শেখ রফি আহম্মেদ আচ্চু বলেন, লেখাপাড়া শেষ করে চাকরি না করে মাছ চাষ করার উদ্যোগে নিই। কিন্তু রেণু পোনার সংকটে কিছুটা জটিলতায় পড়তে হতো। প্রথম দিকে গাইবান্ধা থেকে রেণু পোনা এনে মাছের চাষ করতাম। আর এখন আমাদের থেকেই রেণু পোনা নিচ্ছেন আশপাশের জেলার মাছচাষিরা।
তিনি আরও বলেন, প্রথম যখন মাছ চাষ শুরু করি, তখন অনেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলত। জেলে বলে ডাকত, এখন তারাই মাছ চাষ করে ভাগ্য ফিরিয়েছে। সে সময় কখনও চিন্তা করিনি যে, মাছ চাষে এমন বিপ্লব ঘটে যবে। এখন ঘরে ঘরে মাছ চাষি দেখে খুব ভালো লাগে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কালিপদ রায় বলেন, আদমদীঘি উপজেলার মাছচাষিরা দেশের পুষ্টির জোগানে বড় অবদান রাখছেন। তাদের সরকারিভাবে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
রেণু রপ্তানির বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতে সরকারিভাবে পাঙাশ মাছের রেণু রপ্তানির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
সূত্র:সমকাল
