দেশের উপকূল ও গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠনে চিংড়ি খাত বহু দশক ধরে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে।
দেশের উপকূল ও গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠনে চিংড়ি খাত বহু দশক ধরে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। এ শিল্পটি শুধু রোজগারের সুযোগই বাড়ায়নি, বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকাও নিশ্চিত করেছে। এরপরও এ খাত এখন সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চিংড়ি খাত থেকে রফতানি আয় কমার পাশাপাশি বহু বছর ধরে এর উৎপাদন স্থির হয়ে আছে। বৈশ্বিক বাজার দ্রুত প্রতিযোগিতামূলকভাবে বেড়ে ওঠায় দেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিসহ খাতসংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গতকাল চিংড়ি খাত নিয়ে আয়োজিত এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। “ট্রান্সফর্মিং পলিসি সাপোর্ট ফর রিভাইভিং বাংলাদেশ’স শ্রিম্প সেক্টর” শীর্ষক এ নীতি সংলাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। অনুষ্ঠানের গণমাধ্যম সহযোগী ছিল বণিক বার্তা।
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, ‘রফতানি নীতিতে গার্মেন্টের সঙ্গে চিংড়িও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ৮০-৯০-এর দশকে গলদা, বাগদা রফতানি করতে গিয়ে দেশের স্থানীয় বাজারে চিংড়ির সংকট পড়ে গিয়েছিল। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিবায়োটিক ও জেলির
মতো সমস্যা আমাদের চিংড়ি রফতানিকে সংকটে ফেলে দিয়েছে।’
যেকোনো নীতিমালা তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকজন মাঠপর্যায়ে না গিয়ে নীতি তৈরি করলে সঠিক নীতিমালা করা সম্ভব হবে না বলেও মনে করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে প্রচুর মাছ ধরা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, সমুদ্রে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধভাবে মাছ ধরার কারণে গত সাত বছরে ৭৮ শতাংশ মাছের উৎস কমে গেছে। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। মৎস্য খাত থেকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের কথা অবশ্যই ভাবতে হবে, তবে পরিবেশ কিংবা স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করে নয়।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য আলাদা ব্যাংক করা উচিত বলেও মনে করেন উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, ‘চিংড়িকে কৃষি খাতের আওতায় উপখাত নয়, পূর্ণাঙ্গ খাত হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়া উচিত। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যাংক করার প্রস্তাব দিয়েছি। এ বিষয়ে চিন্তা করা যায় এবং করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘চিংড়ি যথেষ্ট সম্ভাবনাময় খাত। অর্থায়ন এ খাতের একমাত্র সমস্যা নয়। উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকাই আমাদের মূল সমস্যা। ভারত ও বাংলাদেশের উৎপাদনের পার্থক্যের চিত্রই তা বলে দেয়। উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন জায়গা কিনে রেখেছে, কিন্তু ব্যবহার করেনি। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে যারা প্রকৃত উদ্যোক্তা, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। যেখানে সমস্যা, সেখানে নজর দিতে হবে। আমাদের একসঙ্গে এর সমাধান বের করতে হবে। আর্থিক দিকে যদি কোনো সমস্যা হয়, সেটা আমরা বিবেচনা করব। তবে উৎপাদন, প্রক্রিয়া ও রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে।’
গভর্নর বলেন, ‘প্রতিযোগী দেশগুলো ভেনামি চিংড়ি চাষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে এগিয়ে গেলেও আমাদের এখানে কেন চাষ শুরু করা যায়নি, এর পেছনে দায়ীদের খুঁজে বের করতে হবে। অবহেলা করার কারণেই এ খাতে আমাদের বৈদেশিক আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে পুরো খাতকে পুনর্গঠন করতে হবে। সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা দরকার। সরকারের ভূমি যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে। কারণ, এ ভূমি নির্দিষ্ট কারণেই ভাড়া বা ইজারা দেয়া হয়েছে। কেউ যদি ভূমির যথাযথ ব্যবহার না করে, তাদের নোটিস দেয়া দরকার।’
নীতি সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার। তিনি বলেন, ‘২০০০ সালে বাংলাদেশ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানির পরিমাণ একই রকম ছিল। কিন্তু গত ২৪ বছরে ভারত ১৪ গুণ, ভিয়েতনাম ৫ গুণ এবং ইন্দোনেশিয়া রফতানি ৩ গুণ বাড়িয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা একই রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে এ খাতে আমাদের রফতানি ছিল ৩৩ কোটি ডলার। আমাদের দেশে বাগদা চিংড়ির হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন মাত্র দশমিক ৩৩ টন। আর গলদা চিংড়ির ক্ষেত্রে তা দশমিক ৫২ টন। অথচ ভারতে প্রতি হেক্টরে আমাদের চেয়ে ১৪ গুণ বেশি বা সাত টনের বেশি চিংড়ি উৎপাদিত হয়। ভিয়েতনামে উৎপাদিত হয় সাড়ে তিন টন। কম উৎপাদনশীলতা, উচ্চ সুদহার এবং ঋণ না পাওয়ায় এ খাতের উৎপাদন সক্ষমতার ২০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। ৬০ শতাংশ খামারি উৎপাদন ছেড়ে দিয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘চিংড়ি খাতকে এগিয়ে নিতে পূর্ব অর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। এ খাতের জন্য ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করে কারখানা প্রতি ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ দেয়া উচিত। কাঁচামাল আমদানির জন্য শুধু ব্যাক টু ব্যাক এলসি (ঋণপত্র) খোলার অনুমতির বিপরীতে ওই তহবিল ব্যবহার করা যেতে পারে। এর আওতায় অভ্যন্তরীণ কিংবা আন্তর্জাতিক—উভয় বাজার থেকেই কাঁচামাল ক্রয় করা যেতে পারে। কৃষক, হ্যাচারি, ফিড কোম্পানি ও প্রক্রিয়াকারকরা যাতে কৃষি খাতের সুবিধা পেতে পারে, সেজন্য চিংড়ি খাতকে কৃষি খাতের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।’
স্বাগত বক্তব্যে বিএফএফইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. তরিকুল ইসলাম জহির বলেন, ‘বাংলাদেশের চিংড়ি খাতের সম্ভাবনা এখনো বিশাল। যথাযথ নীতিগত সহায়তা, উন্নত অর্থায়ন, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও শক্তিশালী বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করতে পারলে এ খাতকে শুধু পুনরুজ্জীবিত করাই নয়, বরং নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে চাই। এজন্য মৎস্য খাতকে কৃষি খাতের সমতুল্য সুবিধার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে এ খাতের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং স্বল্প সুদে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি গ্রহণ ও কৃষক প্রশিক্ষণ শক্তিশালী করা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও রফতানি মান-নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করা এবং জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই অ্যাকুয়াকালচার ব্যবস্থা উন্নয়ন করা দরকার।’
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বাজারে চিংড়ি রফতানির ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা রাখছেন ব্রিটিশ বাংলাদেশী উদ্যোক্তা ইকবাল আহমেদ ওবিই। এনআরবি ব্যাংক পিএলসি ও সি মার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে থাকা এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘দুই যুগের বেশি সময় ধরে আমি বাংলাদেশ থেকে সামুদ্রিক খাদ্য আমদানি করেছি এবং যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছি। মাছ চাষ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ—সবকিছুই করেছি। ১৯৯৭ সালে এ খাতে বড় পরিবর্তন আসে। তখন আমি থাইল্যান্ডে গিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করি। তারা প্রথমে বলেছিল আমাদের প্রজেক্ট খুব ছোট। কিন্তু আমি বলেছিলাম যদি সহযোগিতা পাই তাহলে সমুদ্র খাতে পুরো কমিউনিটিকে উপকৃত করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘এক সময় মুরগি উৎপাদনে আমাদের খরচ সিঙ্গাপুরের থেকেও বেশি ছিল, এখন যেকোনো দেশের তুলনায় কম। পোলট্রি শিল্প যেভাবে সফল হয়েছে, তেমনি সি ফুড উৎপাদনেও আমরা সফল হতে পারি। অতীতে চীন থেকে উন্নত জাতের ধান এনে বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছিল, ঠিক একইভাবে আমাদের চিংড়ি খামারগুলোকেও আধুনিক করতে হবে। এজন্য আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সুপার মার্কেটে রফতানির ক্ষেত্রে অনুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক ব্যবহার ও কৃষি খামার সম্পর্কিত কঠোর কমপ্লায়েন্স মেনে চলার একটি শক্তিশালী প্রয়োগিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। এছাড়া টেকসই ভবিষ্যতের জন্য আমাদের চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদনের ভিত্তিকেই পুনর্গঠন করতে হবে। যেমন আমার দুটি কারখানা ছিল। একটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে, আরেকটি টিকে আছে, কিন্তু সেটিতে সক্ষমতার মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। এখান থেকে উঠে আসতে হলে ফিড লাইসেন্স, হ্যাচারি লাইসেন্স, মাদার স্টক লাইসেন্স সহজ করতে হবে।’
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫ শতাংশ। কৃষিতে প্রায় ২৩ শতাংশ। তবে চিংড়িতে আমাদের কাঁচামালের অভাব রয়েছে। এ খাতের উৎপাদন বাড়াতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছি। উপকূলীয় অঞ্চলে ক্লাস্টারভিত্তিক চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। সরকারের দিক থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সব অংশীজন একসঙ্গে কাজ করলে অবশ্যই এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ‘সরবরাহ সমস্যাই আমাদের মূল সমস্যা। এ সমস্যার কারণে আমরা রফতানির বাজার হারিয়ে ফেলেছি। গত অর্থবছরে মৎস্য খাতে প্রায় ৪৪২ মিলিয়ন ডলার রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে ২৯৬ মিলিয়ন ডলার এসেছে ফ্রোজেন ফুডস থেকে। চলতি অর্থবছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এ খাতে রফতানি হয়েছে ২১২ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এর অর্থ হলো আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছি, ইতিবাচক পথে ফিরে আসছি। এ ফিরে আসাকে ধরে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয় দরকার। এটা ছাড়া এ খাতের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কঠিন।’
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরী বলেন, ‘ইচ্ছা ও অর্থ থাকলে যেকোনো কিছুই সম্ভব। কিন্তু আমরা খুব একটা ধনী দেশ নই। আমাদের মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। বর্তমানে উচ্চহারে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করাও অনেক কঠিন। সমুদ্রের অবস্থাও ভালো না। মাছের সংখ্যা নানা কারণে কমে গেছে। এরপরও দেশকে এগিয়ে নিতে হবে আমাদের। অর্থনীতিকে উন্নত ও জনস্বাস্থ্যের পুষ্টি নিশ্চিত করতে আমাদের সবার অংশীদারত্ব দরকার। একসঙ্গে কাজ করলেই আমরা এগিয়ে যাব।’
বিএফএফইএর সভাপতি মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সদস্য মেহেদি হাসান মো. হেফজুর রহমানের সঞ্চালনায় নীতি সংলাপে চিংড়ি খাতের উদ্যোক্তা, বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
