কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার দিশাবন গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর আলম-একজন সংগ্রামী, পরিশ্রমী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পারিবারিক খামারি। আজ তার সাফল্যের আলো শুধু নিজের পরিবারেই নয়, পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এই সাফল্য একদিনে আসেনি। শুরুটা ছিল খুবই ছোট, সীমিত সামর্থ্য আর অগাধ মনোবল নিয়ে।
১৯৯৬ সাল। পরিবারের আর্থিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে জাহাঙ্গীর আলম চারটি গরু দিয়ে ছোট্ট একটি পারিবারিক খামার গড়ে তোলেন। তখন গরুর জন্য পাকা ঘর, পর্যাপ্ত জমি বা আধুনিক ব্যবস্থাপনা-কিছুই ছিল না। ছিল শুধু কঠোর পরিশ্রম করার ইচ্ছা। প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি নিজ হাতে গরুর পরিচর্যা করতেন, মাঠ থেকে ঘাস সংগ্রহ করতেন, আর দিনের বাকি সময় সামান্য ব্যবসা করে পরিবারের খরচ চালাতেন। ধীরে ধীরে তার যত্ন, পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতা গরুর সংখ্যা বাড়াতে শুরু করে।
সময় যতোই এগোতে থাকে, তার খামারও ততোই সমৃদ্ধ হয়। কয়েকদিন আগে তিনি তার খামারের ২০টি গরু বিক্রি করেছেন, তবুও খামারে এখনো রয়েছে ২০টি গরু-যা তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও সাফল্যের প্রমাণ। তার খামারের শাহীওয়াল, সংকর এবং মুন্ডি জাতের গাভীগুলো সুস্বাস্থ্য ও উচ্চ দুধ উৎপাদনের জন্য এলাকায় বিশেষ পরিচিত। প্রতিদিন তার খামার থেকে প্রায় ১০০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে একটি অংশ এলাকার স্থানীয় মানুষদের কাছে বিক্রি করেন, আর বাকি অংশ ব্যবহার করেন দই ও দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির ব্যবসায়। ফলে তার আয় বেড়েছে বহুগুণ, আর তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানও।
গবাদিপশুর খাদ্য ব্যবস্থাপনায় তিনি অত্যন্ত সচেতন। গরুর সুস্থতা এবং দুধ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তিনি নিয়মিত খড়, সবুজ ঘাস, খৈল, ভূষি, কুঁড়া ও দানাদার খাদ্য সরবরাহ করেন। শুধু তাই নয়, নিজের খামারের প্রয়োজন মেটাতে তিনি প্রায় দুই কানি জমিতে সবুজ ঘাসের চাষ করেন। ফলে খামার পরিচালনায় খাদ্যের সংকট কখনোই দেখা দেয় না।
অসুস্থ গরুর চিকিৎসা বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে অনেক সমস্যার সমাধান করেন। যখন প্রয়োজন হয়, তিনি পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেন, আর নিয়মিত টিকা ও ঔষধ প্রয়োগ করেন। খামারের প্রতিটি গরু তার কাছে পরিবারের সদস্যের মতো-এই ভালোবাসাই তাকে সাফল্যের পথে আরও এগিয়ে দিয়েছে।
পরিবারের সদস্যরাও এখন তার কাজে সহযোগিতা করছেন। তার খামার শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পরিবারের ঐক্য, উন্নতি এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের অনেক তরুণ জাহাঙ্গীর আলমকে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে, শিখছে কিভাবে অল্প পুঁজি দিয়েও ধৈর্য, অধ্যবসায় আর সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বড় সফলতা অর্জন করা যায়।
জাহাঙ্গীর আলমের খামার এখন দিশাবন গ্রামের একটি সফল মডেল। তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন-আপনি যদি কাজ করতে জানেন, নিয়মিত যত্ন নেন, আর নিজের কাজে বিশ্বাস রাখেন, তাহলে ছোটো শুরু থেকেও বড় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব। গরুর যত্ন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত দুধ উৎপাদন এবং আধুনিক ধারণা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি তার পারিবারিক খামারকে একটি টেকসই এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছেন।
তার গল্প আজ গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে অনুপ্রেরণা হিসেবে। জীবনের প্রতিটি ধাপে কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে এগিয়ে যাওয়া জাহাঙ্গীর আলম নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পারিবারিক খামার ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল উদাহরণ
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
