সামুদ্রিক মাছ বা চিংড়ি—উভয় ক্ষেত্রেই আমরা এখন কিছুটা প্রতিকূল সময় পার করছি। উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই, যার প্রভাব পড়ছে রফতানি আয়ে। এ কারণে আমাদের অগ্রাধিকার এখন উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড পূরণ করা।
সামুদ্রিক মাছ বা চিংড়ি—উভয় ক্ষেত্রেই আমরা এখন কিছুটা প্রতিকূল সময় পার করছি। উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই, যার প্রভাব পড়ছে রফতানি আয়ে। এ কারণে আমাদের অগ্রাধিকার এখন উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড পূরণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে থাকতে হলে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, হেভি মেটালের উপস্থিতি বা গুণগত মানসংক্রান্ত যেসব বিষয় আছে, সেগুলো কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। গুণগত মান উন্নত করতে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে—ল্যাবরেটরি শক্তিশালীকরণ, ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা এবং সেক্টরের প্রতিটি ধাপে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রটোকল (এসওপি) মানা—এসবেই আমরা জোর দিচ্ছি। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার ঘাটতি কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রফতানি আয়ে স্থিতিশীলতা আসবে বলে আমরা আশা করি।
বেসরকারি খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে—গলদা ও বাগদার পাশাপাশি তারা ভেনামি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে আমি মনে করি, ভেনামিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। আমাদের ঐতিহ্যবাহী গলদা ও বাগদার উৎপাদন বাড়ানোরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেসরকারি পর্যায়ে দৃশ্যমান। সরকারের দায়িত্ব হলো স্বাস্থ্যমান, ট্রেসেবিলিটি এবং রফতানি–উপযোগী সেফটি মেকানিজম ঠিকমতো বজায় রাখা। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, পোনা উৎপাদনের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে আমরা নতুন করে কাজ শুরু করেছি।
চিংড়িসহ হিমায়িত খাদ্য রফতানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হচ্ছে, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চিংড়ি রফতানি হয়েছে মাত্র ২৯ কোটি ডলারে। এ পরিস্থিতিতে লক্ষ্য অর্জনে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন বা নেবেন?
লক্ষ্যটি চ্যালেঞ্জিং—এটা আমরা স্বীকার করি। তাই প্রথম কাজ হলো খাতটির প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং নিয়ন্ত্রণে আনা। রফতানিযোগ্য পণ্যের গুণগত মান, স্ট্যান্ডার্ড মেনে প্রক্রিয়াকরণ, লজিস্টিকস, জমি ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর ওপর কাজ প্রয়োজন। এজন্য রেগুলেটরি কাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে; বন্দর, পরীক্ষাগার ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
চিংড়িকে শিল্প থেকে কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ খাতের উদ্যোক্তারা দাবি তুলেছেন। এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?
দাবি যৌক্তিক। শিল্প ক্যাটাগরিতে থাকার কারণে অনেক সুবিধা—বিশেষ করে বিদ্যুৎ, ভর্তুকি, শুল্ক ছাড়—পেতে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। বিদ্যুতের বিষয়ে আমরা এরই মধ্যে সমাধান দিতে পেরেছি, তবে ফিড ও অন্যান্য ইনপুটে এখনো কাজ বাকি রয়েছে। চিংড়িকে কৃষির আওতায় আনতে হলে নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন, যা সময় নিয়ে করা হবে। শুধু চিংড়ি নয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে কৃষির বৃহত্তর কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়ও বিবেচনায় আছে।
শিল্প হওয়ার কারণে চিংড়িতে ব্যাংক ঋণে সুদ ১৬ শতাংশ, অন্যদিকে কৃষিতে ৮ শতাংশ। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
বিষয়টি আমরা ভালোভাবেই জানি এবং গুরুত্ব দিচ্ছি। চিংড়ি উদ্যোক্তারা শিল্প হিসেবে নিবন্ধন করায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও নামের কারণে সমস্যা হয়েছে। এখন আমরা চেষ্টা করছি, চিংড়িচাষী ও এ খাতের উদ্যোক্তারা যাতে এজেন্ট ব্যাংকিং বা অন্যান্য মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যাংকের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় আছে। আপাতত কৃষি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের কমপক্ষে ২০ শতাংশ যাতে এ খাতে যায়, সে উদ্যোগ নিয়েছি।
দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছে। যদিও এটি চাহিদার বিচারে একেবারেই ক্ষুদ্র। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এক্ষেত্রে বহুগুণ এগিয়ে গেছে। ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন সম্প্রসারণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?
আগে ভেনামি চাষের অনুমোদন ছিল না; এখন অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। অনুমোদন বাড়লে নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে। তবে আমাদের কৌশল শুধু আমদানিনির্ভর জাত নয়। আমরা বেশি চেষ্টা করছি আমাদের নিজস্ব জাতগুলোর বিকাশ ঘটাতে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনামির চাহিদা বাড়ছে, তাই এ খাত অবশ্যই সম্প্রসারিত হবে। তবে গলদা–বাগদার সম্ভাবনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা আশা করছি, প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে চিংড়ি চাষ ভবিষ্যতে বড় সুযোগ তৈরি করবে।
