চলতি অর্থবছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন মাছ রফতানি বিদেশি বায়াররা আকৃষ্ট হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে : সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ মাছ বিদেশে রফতানি হচ্ছে
আবারও সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এখানকার চিংড়ি সেক্টর। বাড়ছে রফতানি, বিদেশি বায়াররা আকৃষ্ট হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে। এখন প্রয়োজন উৎপাদন অঞ্চলে চিংড়ি চাষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। দরকার প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে অধিক মনিটরিং এর আওতায় আনা। কারণ সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ মাছ বিদেশে রফতানি হচ্ছে। সূত্রমতে, করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সাল থেকে কমতে থাকে মাছ রফতানি। সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই চলে আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধ। এছাড়া ইউরোপের মন্দা অর্থনীতি, অন্যান্য বিদেশি বাজারে ধস, পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধিসহ নানা কারণে রফতানি কার্যক্রমে হিমশিম অবস্থার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি চাঙ্গা, মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফল প্রাপ্তি, পরিবহনে সংকট নিরসন এবং বিশ্ব যুদ্ধপরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় রফতানি আবার বেড়েছে। পাশাপাশি চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি আর রফতানি আয় বেড়ে যাওয়ায় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের প্রান্তিক চিংড়ি চাষিদের মুখে হাসি ফুটে উঠছে। খুলনা অঞ্চলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাছ ও চিংড়ি রফতানিতে সাফল্য চোখে পড়ার মত। এতে নতুন করে স্বপ্নের বীজ বুনছে এ অঞ্চলের চাষিরা। রফতানিকারক হিমায়িত কারখানাগুলো রুগ্ন অবস্থা থেকে ফের চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। এই অর্থবছরে মোট ৩৪ হাজার ৮৭৬.৩৭ টন মাছ রফতানি করে বাংলাদেশ তিন হাজার ১০৯ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের (২০২৩-২৪) তুলনায় নয় হাজার ৬৭৯.৬৩ টন বেশি। গত অর্থবছরে রফতানিকৃত মাছের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ১৯৬.৭৪ টন এবং আয় হয়েছিল দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু চিংড়ি রফতানি থেকেই আয় হয়েছে দুই হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা এবং রফতানি হয়েছে ১৯ হাজার ৫১২.৭৯ টন চিংড়ি। অন্যদিকে, অন্যান্য মাছ রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৬১০ কোটি টাকা, রফতানি হয়েছে ১৫ হাজার ৩৬৩.৫৮ টন। আগের বছর চিংড়ি রফতানি হয়েছিল ১৫ হাজার ৪৫০.৯৭ টন এবং আয় হয়েছিল এক হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। অন্য মাছ রফতানিতে আয় হয়েছিল ৪০২ কোটি টাকা, পরিমাণ ছিল নয় হাজার ৭৪৫.৭৮ টন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বের ৫০টি দেশে বিক্রি হচ্ছে গলদা-বাগদা চিংড়ি। দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলায় গলদা চিংড়ি উৎপাদন। এখানে শতকে গলদা আট কেজি পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে। এই উপজেলার মাছ সরাসরি আমেরিকায় রফতানিতে প্রক্রিয়াধীন। আমেরিকা ইতোমধ্যে ঘেরের নিবন্ধন চেয়েছে। ৪০টি ঘেরের সম্পূর্ণ তথ্য তাদের কাছে প্রেরণ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। শিগগিরি ডুমুরিয়ার চিংড়ি সরাসরি আমেরিকায় রফতানি হবে বলে মৎস্য দফতরের আশা। তবে বাগদা উৎপাদনে বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা শীর্ষে রয়েছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাষিরা আধুনিক পদ্ধতিতে যতœশীল হয়ে চিংড়ি চাষ করলে বিশ^বাজারে এর কদর আরো বেড়ে যাবে। গলদা চিংড়ি বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রেড অনুযায়ী এক কেজি গলদা এক হাজার ৬০০ টাকা আর বিদেশে গড়ে এক হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। আর মোট উৎপাদিত গলদা ৩২ হাজার ৬৩০.৯৫ মেট্রিক টন। সে হিসেবে এই গলদা থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। প্রতি হেক্টর জমিতে মাছের রেনু পোনা, খাবার ও পরিচর্যায় সর্বোচ্চ ব্যয় হয় দুই লাখ ৪৪ হাজার থেকে দুই লাখ ৪৬ হাজার টাকা। কিন্তু ওই প্রতি হেক্টরে চাষি মাছ বিক্রি করেন পাঁচ লাখ টাকা, যার অর্ধাংশ মুনাফা অর্জনের অর্থনৈতিক দ্বার উন্মোচিত হয়।
মৎস্য কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, ক্লাস্টার পদ্ধতির মতো আরো নতুন আধুনিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ, সরকারি উদ্যোগ এবং সহায়তা মৎস্য চাষিদের প্রয়োজন। তাহলে মৎস্য উৎপাদনও তুলনামূলক বৃদ্ধি করা সম্ভব। সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্প সূত্রে, খুলনার কয়রা, ফুলতলা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, তেরোখাদা, দিঘলিয়া, বটিয়াঘাটা এবং দাকোপে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া প্রকল্প ছয় বছর ধরে চলছে। চলতি ডিসেম্বরে এটা শেষ হবে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) পরিচালক এম এ হাসান পান্না বলেন, রফতানি আয় বৃদ্ধির বিষয়টির সঙ্গে ডলারের দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও রয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে আমরা আমাদের সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ মাছ রফতানি করছি। বাকি মাছ আমরা সংগ্রহ করতে পারছি না। পোনা ও ভালো মাছের সংকটও রয়েছে। বিকারুল ইসলাম নামের এক মৎস চাষি ইনকিলাবকে বলেন, একজন মৎস্য চাষিকে প্রতিদিন ১০-১৫ কেজি মাছ শহরের বাজারে কিংবা কোম্পানিতে পাঠাতে হিমশিম খেতে হয়। অল্প মাছের জন্য বড় কোনো পরিবহন ভাড়া করে সঠিক সময়ে মাছ পরিবহনও কঠিন ছিল। কিন্তু ২৫টি ঘেরের মাছ সংগ্রহ করে সম্মিলিতভাবে পরিবহন ভাড়া করে সঠিক সময়ে বাজার কিংবা কোম্পানিতে পাঠানো সহজ। এতে পরিবহন খরচ সাশ্রয় করে এবং তাজা মাছের লাভজনক দাম পেয়েছে চাষিরা। এজন্য মৎস্য চাষিরা ক্লাস্টার পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে তাজা চিংড়ি সরবরাহের মাধ্যমে চিংড়ি রফতানিতে ভূমিকা রাখছে।
