কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলার আশকামতা গ্রামের বাসিন্দা মো. কুদ্দুস আজ একজন সফল দুগ্ধ ও গবাদিপশু খামারি হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তিনি বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। তবে শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তার স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন তার বাবা গরু পালন করতেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তার জীবনের পথনির্দেশক হয়ে ওঠে।
আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে পারিবারিকভাবে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে মাত্র একটি গাভী পান। অনেকের কাছে যা ছিল তেমন কিছু নয়, কিন্তু মো. কুদ্দুসের কাছে সেটিই ছিল স্বপ্নের বীজ। সীমিত সামর্থ্য, অভিজ্ঞতার অভাব ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই একটি গাভী দিয়েই খামার গড়ে তোলার যাত্রা শুরু করেন।
শুরুতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। গরুর খাদ্য, চিকিৎসা ও পরিচর্যা সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল সীমিত। তবুও স্থানীয় অভিজ্ঞ খামারি, প্রাণিসম্পদ অফিস এবং নিজ উদ্যোগে শেখার চেষ্টা চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে তিনি গরু পালনের কৌশল রপ্ত করেন। একটির পর একটি গাভী যুক্ত হতে থাকে তার খামারে।
বর্তমানে মো. কুদ্দুসের খামারে ফ্রিজিয়ান জাতের ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টি গরু রয়েছে। আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনার কারণে তার খামারটি এখন এলাকায় একটি আদর্শ খামার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন তার খামার থেকে প্রায় ৮০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এই দুধ তিনি স্থানীয় বাগমারা বাজারে পাইকারি দরে বিক্রি করেন। দুধ বিক্রির আয় থেকেই তিনি তার পরিবার পরিচালনা করেন এবং খামারের খরচ বহন করেন।
খামারের সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও নিয়েছেন মো. কুদ্দুস। খামারের গরুর গোবর ব্যবহার করে তিনি একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি রান্নার জ্বালানির চাহিদা পূরণ করছেন। ফলে একদিকে যেমন তার জ্বালানি খরচ কমেছে, অন্যদিকে পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে উৎপন্ন স্লারি তিনি জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করেন, যা ঘাস চাষে বেশ উপকার দিচ্ছে।
খামারের গাভী থেকে প্রাপ্ত ষাঁড় বাছুরগুলো তিনি মোটাতাজাকরণ করে থাকেন। পরিকল্পিতভাবে খাদ্য ও পরিচর্যার মাধ্যমে এসব গরু কুরবানির ঈদের উপযোগী করে তোলেন। প্রতি বছর কুরবানির ঈদে তিনি ৪-৫টি মোটাতাজা গরু বিক্রি করেন, যা তার অতিরিক্ত আয়ের একটি বড় উৎস। এই আয় তার খামার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও মো. কুদ্দুস অত্যন্ত সচেতন। তিনি নিজের ৩ কানি জমিতে নেপিয়ার ও অন্যান্য উন্নত জাতের ঘাস চাষ করেন। এতে গরুর জন্য সবুজ খাদ্যের ঘাটতি থাকে না। পাশাপাশি বাজার থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিড, খড়, ভূষি ও খৈল কিনে গরুকে খাওয়ান। সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফলে গরুগুলো সুস্থ থাকে এবং দুধ উৎপাদনও ভালো হয়।
গরুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে তিনি কোনো ধরনের অবহেলা করেন না। গাভী অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সহায়তা নেন এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ প্রাণি চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা করান। নিয়মিত টিকা প্রদান ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ফলে তার খামারে রোগবালাই তুলনামূলকভাবে কম।
মো. কুদ্দুস মনে করেন, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে অল্প পুঁজি দিয়েও সফল হওয়া সম্ভব। তার এই সাফল্য আশপাশের অনেক বেকার যুবককে খামার গড়তে অনুপ্রাণিত করেছে। অনেকেই তার খামার দেখতে আসেন এবং পরামর্শ নেন। তিনি নিজেও নতুনদের সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
এক সময় যে মানুষটি আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি, আজ তিনি নিজেই অন্যদের কর্মসংস্থানের পথ দেখাচ্ছেন। মো. কুদ্দুসের জীবন সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, আন্তরিকতা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে গ্রাম থেকেই গড়ে তোলা যায় টেকসই সফলতা। তার এই উদ্যোগ শুধু তার পরিবারের ভাগ্য বদলায়নি, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মো. কুদ্দুসের মতো খামারিরাই দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তার সফলতা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
