এক সময় গরু জবাইয়ের পর নাড়িভুঁড়ি ও পেনিস (পিজল) উচ্ছিষ্ট হিসেবে খাল-বিল, নদী-নালায় ফেলে দেওয়া হতো। পরিবেশ দূষণের কারণ হিসেবে বিবেচিত এসব বর্জ্য এখন দেশের অপ্রচলিত রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে।
গরুর তৃতীয় পাকস্থলী বা ‘ওমাসম’ এবং পিজল রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা বৈদেশিক মুদ্রায় আয় প্রায় ৩০০ কোটি।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন, হংকং, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে এসব পণ্য।
বর্তমানে চট্টগ্রামের অন্তত ১০ জন এবং সারাদেশে প্রায় ৪০ জন ব্যবসায়ী ওমাসম ও পিজল রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
রপ্তানিকারকদের তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে এই দুই পণ্যের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, যা দেশের অপ্রচলিত রপ্তানি খাতের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গরু জবাইয়ের পর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কসাইদের কাছ থেকে ওমাসম ও পিজল সংগ্রহ করেন।
জবাইয়ের দুই ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয় এসব পণ্য। পরে তা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করা হয়। আড়তদাররা পরিষ্কার, প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের পর রপ্তানিকারকদের কাছে সরবরাহ করেন। রপ্তানিকারকরা কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করে একাধিক চালান একত্রিত করে কনটেইনারভর্তি পণ্য বিদেশে পাঠান।
আড়তদাররা কাঁচা লবণযুক্ত পিজল প্রতি পিস ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কিনে প্রক্রিয়াজাত করার পর কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেন। একইভাবে কাঁচা ওমাসম প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতের পর ৮০০ থেকে হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ওমাসম ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার মার্কিন ডলার এবং পিজল ৬ হাজার ৮০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়।
চট্টগ্রামের আতুরার ডিপোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ওমাসম ও পিজল প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় বাজার। সংগ্রহ থেকে রপ্তানি পর্যন্ত চট্টগ্রামের প্রায় ৩০টি আড়তে এক হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন। সারাদেশে এ খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার।
ওমাসম রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী মোহাম্মদ আলী হোসেন জানান, গরুর ওমাসম সংগ্রহের পর প্রথমে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হয়। এরপর লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। পরে আবার ধুয়ে উল্টে (ব্যাক সাইড করে) ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা হয়। সবকিছু যাচাই-বাছাই শেষে গ্রেডিং করে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। এরপর কনটেইনারে ভরে বিদেশে পাঠানো হয়।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ থেকে মূলত চীন, হংকং ও ভিয়েতনামে ওমাসম রপ্তানি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা সব ওমাসম চট্টগ্রামে এনে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এখান থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। মাসে গড়ে ৮ থেকে ১০টি কনটেইনার বিদেশে যায়। বিদেশে যাওয়ার পর এসব পণ্য আরও উন্নত প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয়।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত আরেক সরবরাহকারী মোহাম্মদ ইউনুস। বেশ কয়েক বছর ধরে এই ব্যবসায় জড়িত তিনি। ওমাসম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় গরু ও মহিষ জবাইয়ের পর ওমাসম বা সাতপাল্লা কোনো মূল্যবান পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতো না। এগুলো খাল-বিল, নালা-নর্দমায় ফেলে দেওয়া হতো। এমনকি কুকুরও অনেক সময় এসব খেত না।
মোহাম্মদ ইউনুস আরও বলেন, ওমাসম সংগ্রহের পর দেশীয় লবণ ব্যবহার করে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো বিদেশি উপকরণের প্রয়োজন হয় না। পরে প্রক্রিয়াজাত করে চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ওমাসমের দাম বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।
তিনি বলেন, বর্তমানে এই খাত থেকে বছরে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। প্রতিবছর কয়েক ডজন কনটেইনার ওমাসম বিদেশে রপ্তানি হয়। সঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা গেলে এই খাতের পরিধি আরও বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখা সম্ভব হবে।
রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন জবাই হওয়া গরুর মাত্র অর্ধেকের ওমাসম ও পিজল বর্তমানে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। কোরবানির ঈদের সময় জবাইকৃত পশুর প্রায় ৯০ শতাংশ ওমাসম ও পিজল সংগ্রহের বাইরে থেকে যায়। দেশের সব অঞ্চলে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এ খাত থেকে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
বিদেশে রপ্তানি হওয়া ওমাসম ও পিজল দিয়ে উন্নতমানের স্যুপ, সালাদসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। বিশেষ করে চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে ইউরোপের বাজারেও প্রবেশের পরিকল্পনা করছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। ফলে একসময়ের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট এখন দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
সূত্র: বাংলা নিউজ ২৪.কম
