
তরিকুল ইসলাম সুমন, ঢাকা: সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৫০ (২০২৫-২০৭৫) বছরের মাস্টার প্লান তৈরি করেছে সরকার। তিনটি পর্যায়ে নতুন রপ্তারি জোনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এর বিপরীতে আয়ে হবে প্রতি বছর প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৪ হাজার কোটি টাকা।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত সরকারি চিংড়ি এস্টেট ও সংলগ্ন এলাকা একটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে, যা তিনটি পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে চিংড়ি এস্টেটের (সরকারি) ৭ হাজার একর মূল জমি এবং সংলগ্ন ২১ হাজার একর এলাকায় সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় আধুনিক সামুদ্রিক মৎস্য চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হবে। এ জন্য জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও সহায়ক অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাঁধ, যাতায়াতের জন্য সড়ক, ফিশ ল্যান্ডিং স্টেশন, বরফ কল ও ফিশ ফিড কারখানা, আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণন কেন্দ্র ও ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পর্যটন বিকাশের জন্য তৈরি হবে একটি ইকোপার্ক। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা হবে বাঁধসংলগ্ন এলাকায়। পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ব্যাপক ভূমি ব্যবহার এবং জোনিং কাঠামো।
সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মনিষ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘প্রায় ২৮ হাজার একর জমির এ বিশাল কর্মযজ্ঞ। নতুন রপ্তানি জোনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রায় ৬১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এখানে সরকারি ও বেসরকারি পার্টনারশিপ, অপরদিকে বিদেশিদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগও হতে পারে। এক্ষেত্রে মডেল ৮০ থেকে ২০ অনুযায়ী সরকারিভাবে ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা এবং প্রাইভেট বা বেসরকারি ২০ শতাংশ বিনিয়োগ অর্থাৎ ১২ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। মডেল ৭০ থেকে ৩০ এবং ৬০ থেকে ৪০ মডেল তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি ও প্রথম ধাপ অনুযায়ী উৎপাদন ৭১৫ মেট্রিক টন, দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ৪ হাজার ২২৪ মেট্রেক টন এবং তৃতীয় ধাপে উৎপাদন ১১ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন। যার ধারাবাহিকতায় প্রথম ধাপের ৫ বছরে আয় ৭২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ডলার এবং ৩৩৮ মিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাব্য হিসেবে করা হয়েছে।
মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, মৎস্য চাষ, প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহ, ইকো-ট্যুরিজম এবং পরিষেবা খাতে এখানে প্রায় ৫০ হাজার এরও বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা এলাকার দারিদ্র্যতা হ্রাসে সহায়তা করবে। এখানে দেড় লাখ মানুষের বসবাসের সুযোগ তৈরি করা হবে। যাতায়াত ব্যাবস্থা সহজীকরণের জন্য চৌফলদীতে মাতামুহুরী নদীর ওপর একটি নতুন সেতু প্রস্তাব করা হয়েছে, যার সঙ্গে একটি পেরিফেরাল ডাইক-রোড থাকবে যা প্রাথমিকভাবে ২৬ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৫০ বছরের মধ্যে ১১০ কিলোমিটারে উন্নীত হবে। এস্টেটটি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জাতীয় রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সংযুক্ত থাকবে, যা এটিকে একটি প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে। সমান্তরালভাবে, মৎস্য চাষ এবং পূর্ব-সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে সহায়তা করার জন্য ব্রডব্যান্ড, মোবাইল টাওয়ার এবং এস্টেট-ব্যাপী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারিত করা হবে। বিকল্প শক্তির উৎসের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
পরিবেশগত এবং স্থিতিস্থাপকতা ব্যবস্থা সর্বত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাটি ৩০ কিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বেল্ট পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে, বৃহৎ পরিসরে উপকূলীয় বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করবে। বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা এবং বর্জ্য-মূল্য-পুনর্ব্যবহার পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর করবে। বন্যার মডেলিং ইঙ্গিত দেয় যে ১০০ বছরের বন্যায় এস্টেটের ৯৪ শতাংশ প্লাবিত হতে পারে; এর মোকাবিলায়, বাঁধগুলো উঁচু করার প্রস্তাব করা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়-প্রতিরোধী পুকুর চালু করা হয়েছে এবং লবণাক্ততা-সহনশীল চিংড়ির প্রজাতি গ্রহণ করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তি সমাধান-সৌর বায়ু চলাচল, জোয়ার পাম্প এবং বায়ু শক্তি- কার্বন তীব্রতা আরও কমিয়ে দেবে।
মনিষ কুমার মণ্ডল আরো বলেন, ‘সামুদ্রিক মৎস্য চাষ আধুনিকীকরণ হবে উৎপাদন কার্যক্রমের মূল ভিত্তি। সনাতন উৎপাদন থেকে আধা-নিবিড় এবং নিবিড় ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। এটি করতে গিয়ে বিদ্যমান পুকুর সংস্কার করা হবে, উন্নত স্লুইসগেট স্থাপন করা হবে, আধুনিক হ্যাচারি, ফিড মিল, ডায়াগনষ্টিক ল্যাবরেটরি এবং রোগ নজরদারি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে উৎপাদন ১ দশমিক ১ মেট্রিক টন/হেক্টর থেকে ৫ মেট্রিক টন/হেক্টরের বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার বার্ষিক রপ্তানি আয় হবে আনুমানিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৪ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২০ টাকা হিসেবে)। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সক্ষমতা অর্জনের জন্য পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের কোয়ারেন্টাইন সুবিধা ও ল্যাব এর ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে।
এই পরিকল্পনাটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপ (২০২৬-২০৩০) পুকুর পুনর্বাসন, স্লুইসগেট মেরামত এবং পাইলট আধা-নিবিড় চাষের মাধ্যমে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোকে স্থিতিশীল করবে। প্রথম ধাপে মোট ২,৩৪২ দশমিক ৫ হেক্টর এলাকায় উন্নত এক্সটেনসিফ এবং সেমি ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের মাধ্যমে প্রকল্পের ভিত্তি গড়ে তোলা হবে। এ পর্যায়ে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১৫২ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ধাপে বছরে প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে এবং চিংড়ি এস্টেটের মৌলিক অবকাঠামো তৈরি করা হবে। এ পাঁচ বছরে মোট প্রায় ৬৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বছরে অপারেশনাল ব্যয় প্রায় ১০ দমমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ প্রায় ৫১০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এই ধাপ মূলত ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য আর্থিক ও অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করবে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০৩১-২০৪৫) আধা-নিবিড় জলজ চাষ সম্প্রসারণ করবে, প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, আবাসিক এবং সামাজিক সুবিধা এবং ইকো-ট্যুরিজম অঞ্চল তৈরি করবে। সম্প্রসারণের ধাপ, যেখানে উৎপাদন ব্যবস্থাকে সেমি ইনটেনসিভ এবং ইনটেনসিভ চাষ পদ্ধতির দিকে উন্নীত করা হবে। প্রায় ৮ হাজার ৯০০ হেক্টর এলাকায় বছরে প্রায় ৪২ হাজার ২৪২ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পর্যায়ে বছরে প্রায় ৬১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা ১৫ বছরে মোট আয় প্রায় ৯ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বছরে অপারেশনাল ব্যয় প্রায় ৪১ মিলিয়ন ডলার এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রায় ৬৯৫ মিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে। এই ধাপ চিংড়ি খাতের অর্থনৈতিক উৎপাদন ও ভ্যালু চেইনকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে।
তৃতীয় ধাপ (২০৪৬-২০৭৫) বৈচিত্র্যময় জলজ চাষ, নবায়নযোগ্য শক্তিচালিত খামার, পূর্ণ-স্কেল ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং ১ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দাকে সহায়তাকারী আধুনিক বসতিসহ একটি চিংড়ি শহরকে একীভূত করবে। হলো প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ধাপ, যেখানে ইনটেনসিভ এবং সুপার ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করা হবে। এই পর্যায়ে বছরে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং উচ্চ ঘনত্বের চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা হবে। এ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৩০ বছরের সময়কালে মোট আয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই ধাপ প্রকল্পটির সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা প্রদর্শন করে।
মাস্টার প্ল্যানে আরও বলা হয়েছে, ২০৭৫ সালের মধ্যে, চকরিয়া চিংড়িশহর বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির একটি প্রধান প্রতীক হিসেবে দাঁড়াবে: একটি জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক জলজ চাষ কেন্দ্র। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো, পরিবেশগত পুনরুদ্ধার এবং বিস্তৃত-ভিত্তিক জীবিকা প্রদান করবে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই উপকূলীয় উন্নয়নের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করবে। তিনটি ধাপে চিংড়ি এস্টেটের মোট আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা প্রধম ধাপে এ বছরে প্রায় ২১০ মিলিয়ন ডলার থেকে তৃতীয় ধাপে বছরে প্রায় ২৩ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। আয়ের প্রধান উৎস হবে চিংড়ি বিক্রি, ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য এবং বাই-প্রোডাক্ট ব্যবহার। এই বহুমুখী আয়ের কাঠামো প্রকল্পটির আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।
মৎস্য অধিদপ্তরে এক কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বৈচিত্র্যময় জীবিকা, শক্তিশালী সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে একীভূত করে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা এলাকাটিকে নীল অর্থনীতির প্রচারের জাতীয় প্রদর্শনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। বর্তমানে এই ৫৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ, স্লুইসগেট নির্মাণ ও সংস্থার, অফিস ও গার্ডরুম নির্মাণ, এ দর্শনা খামার নির্দাণ সব বেড়ি বাাঁধে বনায়ন কার্যক্রম চলছে।
