বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে মৎস্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আর এই খাতের অন্যতম সম্ভাবনাময় উপশিল্প হলো শুটকি উৎপাদন। বিশেষ করে পটুয়াখালী ও বরগুনার বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ শুটকি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত। তবে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, অপরিকল্পিত উৎপাদন ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বাজার সংকটের কারণে সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক জেলে ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শুটকি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। বরগুনার পাথরঘাটা, তালতলী এবং পটুয়াখালীর মহিপুর, আলীপুর ও কুয়াকাটা এলাকায় মৌসুমভিত্তিক শত শত শুটকি পল্লী গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে খোলা পরিবেশে অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে শুটকি উৎপাদনের কারণে এর মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অধিক লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাছ সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে দেশীয় বাজারে শুটকির চাহিদা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
এ অবস্থায় বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায় নিরাপদ ও বিষমুক্ত শুটকি উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সংগঠিত গ্রামোন্নয়ন কর্মসূচি-সংগ্রাম পরিচালিত ‘স্মার্ট ড্রাই ফিস’ উপ-প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা এবং পিকেএসএফের কারিগরি সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্প ইতোমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে।
প্রকল্প ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনে পরিবেশবান্ধব, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে নিরাপদ শুটকি উৎপাদন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় অনেক উদ্যোক্তা এখন খোলা মাঠের পরিবর্তে উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত শুকানোর পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে যেমন শুটকির মান উন্নত হচ্ছে, অন্যদিকে রাসায়নিক ব্যবহারের প্রবণতাও কমছে। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আলম ঘরামী বলেন, ‘আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুটকি তৈরি করতাম। এখন প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে উৎপাদন করছি। এতে বাজারে ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে।’
তালতলীর নিদ্রাচর এলাকার উদ্যোক্তা তামান্না বেগম জানান, ‘আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত শুটকির প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ছে। ভবিষ্যতে বিদেশে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।’
কলাপাড়া উপজেলার নজীবপুর এলাকার উদ্যোক্তা জয়নাল সিকদার বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে শুটকি শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই খাত এখনো প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে। যথাযথ নীতিমালা, মান নিয়ন্ত্রণ, বাজার সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।’
সংগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা চৌধুরী মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘বিষমুক্ত ও নিরাপদ শুটকি উৎপাদন এখন শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিরও একটি বড় সম্ভাবনা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি শুটকির চাহিদা তৈরি হবে।’
সংগ্রামের নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী মুনীর হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যেও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প ও টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে নিরাপদ শুটকি শিল্প একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় নিয়ে আসা গেলে উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বরগুনা ও পটুয়াখালীর শুটকি শিল্প একসময় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে নিরাপদ ও বিষমুক্ত শুটকির আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হলে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো পরিবার অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।
সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব
