
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগিতায় নরওয়ের গবেষণা জাহাজ ‘ড. ফ্রিডটজফ নানসেন’ বঙ্গোপসাগরে এই জরিপ চালায়। ইএএফ-নানসেন সার্ভে ২০২৫ নামে এই জরিপে গভীর সমুদ্রের ছয়টি এলাকা ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় আহরণযোগ্য স্কিপজ্যাক টুনা ও টুনার লার্ভার উপস্থিতি মিলেছে। টুনা আহরণের জন্য ২০২০ সালে লং-লাইনার জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও জাহাজ কেনার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে জাহাজ ভাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র চাওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণে নেওয়া পাইলট প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মো. জুবায়দুল আলম। জাতীয় অর্থনীতিকে তিনি বলেন, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর টুনা ফিশিং শিল্প গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সমীক্ষা ও মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চারটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। বাছাই করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দুটি লং-লাইনার টুনা ভেসেল ভাড়া করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ১২টি ক্রুজ পরিচালনা করবে। এ সময়ে বাংলাদেশের জলসীমায় টুনার প্রাচুর্য বেশি থাকে। এসব অভিযানে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছের প্রাপ্যতা যাচাই, মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট জনবলকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক খন্দকার মাহবুবুল হক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইইজেড) টুনার উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও এর বাইরে বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপসংলগ্ন এলাকায় টুনার প্রাচুর্য বেশি। বিশ্বে টুনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকলেও কিছু দেশের কাছে আঞ্চলিক উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।
জরিপ সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে প্রথমবারের মতো স্কিপজ্যাক টুনা ও অন্যান্য প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। ট্রলার ও হুক-অ্যান্ড-লাইন পদ্ধতিতে স্কিপজ্যাক টুনা ধরা হয়েছে এবং টুনার ঝাঁকও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, স্কিপজ্যাক টুনা ছোট আকারের পরিযায়ী প্রজাতি, যা উষ্ণ ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় সাগরে পাওয়া যায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রজাতি। দেশের উপকূল থেকে ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মাছটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এদের বিস্তৃতি আরও গভীর সমুদ্র পর্যন্ত।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকার পরও পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তের অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট এবং প্রয়োজনীয় জাহাজের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ এ খাতে পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণে সম্ভাবতা যাচাই ও সুস্পষ্ট মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের ওপর জোর দেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র জানায়, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৮টি লং-লাইনার, ৮টি পার্স সেইনার এবং দুটি সহায়ক জাহাজ আমদানি বা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হলেও বেসরকারি খাতের আগ্রহের অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৮ সালে ইন্ডিয়ান ওশান টুনা কমিশনের (আইওটিসি) সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাছ ধরার অধিকার পেয়েছে। তবে এ সদস্যপদের জন্য বছরে প্রায় ৭০ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দিতে হয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকার ২০ শতাংশ উপকূলীয়, ৩৫ শতাংশ অগভীর এবং ৪৫ শতাংশ গভীর সমুদ্র অঞ্চল। ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দেশের জলসীমা, এরপর আন্তর্জাতিক জলসীমা শুরু। তবে দেশের কোনো জাহাজই এখনও আন্তর্জাতিক জলসীমায় গিয়ে মাছ ধরে না। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে ২৩০টি জাহাজ মৎস্য আহরণে নিয়োজিত রয়েছে এবং উপকূলীয় ও অগভীর সাগরে প্রায় ৩০ হাজার ছোট নৌকা সক্রিয়। এছাড়া সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধানে ‘আরভি মীন সন্ধানী’ গবেষণা জাহাজ ব্যবহৃত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, টুনা আহরণ প্রকল্পটির মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ দশমিক ৪৫ কোটি টাকা।
