৩
সংগৃহীত ছবি
সুমন হাওলাদার, কক্সবাজার থেকে ফিরে
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম আপডেট: ১৫.০৫.২০২৬ ১:০৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের মৎস্য খাতে অপার সম্ভাবনার নাম ভেটকি বা কোড়াল মাছ। স্বাদু ও পুষ্টিকর এই মাছটি এখন আর কেবল নদ-নদী বা সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ঘের ও পুকুরে চাষ শুরু হওয়ায় এটি দেশের নীল অর্থনীতি ছাড়িয়ে নতুন মাত্রা যোগ করছে। বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, আধুনিক হ্যাচারি প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার নিরিখে ভেটকি হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রপ্তানি পণ্য। এই কাজটি করছে দেশের একমাত্র ভেটকি হ্যাচারি গ্রীন হাউস মেরিকালচার। যেটি কক্সবাজারের কলাতলিতে অবস্থিত।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা, আধা-লোনা ও স্বাদু পানিতে ভেটকি চাষের বিশাল সুযোগ রয়েছে। আগে জেলেরা প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করে চাষ করত, যা ছিল অনিয়মিত। বর্তমানে আধুনিক নিবিড় ও আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ হওয়ায় প্রতি হেক্টরে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। ভেটকি চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি দ্রুত বর্ধনশীল। সঠিক ব্যবস্থাপনায় একটি পোনা এক বছরে ১ থেকে ২ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে।
স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি বড় ভেটকির দাম ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারেও রয়েছে এ মাছের ব্যপক চাহিদা। উৎপাদন খরচ ও মুনাফার অনুপাত বিবেচনায় এটি গলদা বা বাগদা চিংড়ির চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে লাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।
প্রাকৃতিক উৎসের পোনার ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন কৃত্রিম প্রজননে সফল হয়েছে। হ্যাচারিতে উৎপাদিত ‘স্পেসিফিক প্যাথোজেন ফ্রি’ পোনা চাষের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আর বাংলাদেশে এটি সরকারি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কাজটি করছে ভেটকি হ্যাচারি গ্রীন হাউস মেরিকালচার। দেশে ব্যপক চাহিদা তৈরির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে সারা দেশে মৎস্যচাষীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
হ্যাচারির পোনা সমজাতীয় আকারের হয়, ফলে এদের বৃদ্ধি সমানভাবে ঘটে এবং নরমমাংসভোজী স্বভাবের কারণে ছোট মাছকে বড় মাছের খেয়ে ফেলার হার কমে যায়। প্রাকৃতিক পোনার তুলনায় হ্যাচারির পোনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। আধুনিক হ্যাচারিগুলোতে এখন ৯০শতাংশ পর্যন্ত পোনা টিকে থাকার হার নিশ্চিত করা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক পোনা কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমে পাওয়া যায়, কিন্তু হ্যাচারি প্রযুক্তির কারণে এখন কৃষক নিজের সুবিধামতো সময়ে চাষ শুরু করতে পারছেন।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মাহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, নানা কারণে চিংড়ির উৎপাদন ও রপ্তানি কিছুটা মন্থর হলেও ভেটকি বা কোড়াল মাছের চাহিদা বিশ্বপ্যাপী। এখন আর এটি শুধু লোনা পানির মাছ নয়। সব ধরণের পানিতেই চাষের উপযোগী। আমাদের দেশে আগে প্রাকৃতিক উৎস থেকেই এ মাছের পোনা সংগ্রহ করা হলেও এখন কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন সম্ভব। বছরের প্রায় সময়েই এ পোনা মজুদ করা যায়। ফলে যে কেউ চাইলেই পরিকল্পিতভাবে ভেটকি মাছ চাষ করতে পারেন।
চাহিদা ও পোনা স্বল্পতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা সারাদেশে আমাদের মৎস্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভেটকি চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বর্তমানে উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজার জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ভেটকি চাষ হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যা চাহিদা তা প্রাকৃতিক ও একটি হ্যাচারির মাধ্যমে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে চাহিদা বৃদ্ধি পেলে আগ্রহীদের ভেটকি পোনা উৎপাদনে হ্যাচারির অনুমোদন দেওয়া হবে।
কক্সবাজার থেকে পোনা পরিবহণে পুলিশি হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা ঠিক যে কক্সবাজার থেকে পণ্য পরিবহণে কিছুটা পুলিশি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তার পরেও মাছের পোনা পরিবহণে যাতে করে কোনো সমস্যা না হয়। সে বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের সহায়তা পাওয়া যাবে বলেও জানান মহাপরিচালক।
কক্সবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, আমাদের দেশেও সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন হোটেলে ভেটকি মাছের চাহিদা রয়েছে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি। দেশে অপার সম্ভাবনা রয়েছে এই মাছের। এই মাছ এক বছরে এক থেকে ২ কেজি ওজন হয়ে থাকে। তবে সমস্যা হলো, আমদানি নির্ভর মাছের খাদ্য।
এ কারণে খাদ্য মূল্য একটু বেশি। অনেকে একারণে আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সারাদেশে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক একর পুকুরে নিবিড় পদ্ধতিতে ভেটকি চাষ করে বছরে ১০-১৫ লাখ টাকা মুনাফা করা সম্ভব, যা প্রচলিত মাছ চাষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে ভেটকি বা ‘এশিয়ান সি-বাস’ বা বারামুন্ডি এর চাহিদা আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই মাছের নিয়মিত বাজার রয়েছে। ভেটকির সাদা মাংস, কাঁটা কম হওয়া এবং ‘ফিলেট’ তৈরির উপযোগী হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক ফুড চেইন ও ফাইভ স্টার হোটেলগুলোর প্রথম পছন্দ। এছাড়াও এ মাছে উচ্চ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতি একে স্বাস্থ্য সচেতন বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় করেছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারত ইতিমধ্যে ভেটকি রপ্তানিতে বড় জায়গা করে নিয়েছে; বাংলাদেশও এখন সেই পথে হাঁটছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে ভেটকির উৎপাদন গত পাঁচ বছরে ঊর্ধ্বমুখী। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট ভেটকি উৎপাদন ছিল প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজার জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ভেটকি চাষ হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য হিসেবে ভেটকি রপ্তানির জন্য বাংলাদেশ ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ার চেষ্টা করছে।
একমাত্র হ্যাচারি গ্রীন হাউস মেরিকালচারের ম্যানেজার মাহমুদুল হক বলেন, সরকারি অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় ২০২০ সাল থেকে এই হ্যাচারি ভেটকি নিয়ে গবেষণা করছে। ২০২৩ সাল থেকে ভেটকির পোনা উৎপাদন শুরু করে। শুরুতে পোনা বেঁচে থাকার হার কম থাকলেও এখন কিছুটা বেড়েছে।
তবে পোনা উৎপাদনে যে পরিমাণ ডিম ছাড়ে তার থেকে ২০-৫০ শতাংশ পোনা উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ২০- ৫০ লাখ পোনা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তবে পোনার আকার ভেদে দাম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। আগে প্রাকৃতিক পোনার ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ছিল ৪০-৫০শতাংশ, যা আধুনিক হ্যাচারি পোনার ক্ষেত্রে মাত্র ৫-১০শতাশে নেমে এসেছে।
রোগমুক্ত উৎপাদন: হ্যাচারিতে কঠোর বায়োসিকিউরিটি মেইনটেইন করায় পোনাগুলো ভাইরাসমুক্ত থাকে, যা বাণিজ্যিকভাবে ঝুঁকি কমায়। সমস্যা বিষয়ে তিনি বলেন, মাদকপ্রবণ এলাকা হওয়ার কারণে পোনা পরিবহন করা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়। পরিবহণ মালিকরাও পোনা পরিবহন করতে চায় না। এবিষয়ে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
তিনি আরো বলেন, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকলেও ফিড বা খাবারের উচ্চমূল্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভেটকি শিকারি মাছ হওয়ায় একে উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার দিতে হয়। দেশে মানসম্মত ফিড মিল স্থাপন এবং পোনা সহজলভ্য করতে পারলে উৎপাদন খরচ ৩০শতাংশ কমানো সম্ভব। এছাড়া সরকারিভাবে ‘ক্লাস্টার ফার্মিং’ বা গুচ্ছ চাষ পদ্ধতির প্রবর্তন করা প্রয়োজন।
মৎস্য অধিদপ্তর ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ হাজার মে.টন উৎপাদন হলেও ১হাজার ২০০ মে.টন রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছর ৫৮ হাজার মে.টন উৎপাদন হলেও ১৬৫০ মে.টন রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছর ৬৫ হাজার ৫০০ মে.টন উৎপাদন হলেও ২ হাজার ১০০ মে.টন রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২২০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছর ৭৫ হাজার মে.টন উৎপাদন ও ৩৫০০ মে.টন রপ্তানির মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে।
