১৬
বিকল্প হিসাবঃ
সকলেই জানেন মাছকে খাদ্য খাওয়ানো হলে মাছ বড় হয়। আমিও সকলের মতই সহজ সরল সমীকরণে তেমনই জানি।
অর্থাৎ খাদ্য খেলে মাছ বড় হয় এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু না বিজ্ঞানীরা গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও জলাশয় দুষণে জলাশয়ে প্রয়োগকৃত খাদ্যই অনেকাংশে দায়ী। দেখুন জলাশয় দূষণে খাদ্য কিভাবে ভূমিকা রাখে –
মাছচাষের জলাশয়ে যে খাদ্য প্রয়োগ করা হয় তার ৮০-৯০% এর বেশি খাদ্য মাছ খেতে পারে না অর্থাৎ প্রয়োগকৃত খাদ্যের ১০-২০% অর্থাৎ গড়ে ১৫% খাদ্য মাছ কর্তৃক অভক্ষিত (Uneaten) অবস্থায় পানিতে থেকে যায়।
আবার মাছ কর্তৃক ভক্ষিত (eaten) ৮০-৯০% খাদ্য এর ৮০-৯০% খাদ্য, পুষ্টি হিসেবে ইনটেনস্টাইন কর্তৃক শোষিত হয়। অপরদিকে ভক্ষিত (eaten) খাদ্যের ১০-২০% অর্থাৎ গড়ে ভক্ষিত খাদ্যের ১৫% খাদ্য, মল আকারে পানিতে চলে যায় (Boyd et al. 2007)।
তাছাড়া মাছকে যে খাদ্য (পিলেট) খাওয়ানো হয় তা ৯০% শুষ্ক অর্থাৎ খাদ্যে ১০% পানি থাকে।
অপরদিকে খাদ্য খাওয়ানোর ফলে যে মাছ উৎপন্ন হয় তা শুকানো বা শুটকি করা হলে তার ওজন ২৫% হয় অর্থাৎ ভেজা মাছ থেকে ৭৫% পানি বের হয়ে যায়। জলাশয় দূষণে খাদ্যের ভূমিকা জানতে আসুন জটলাগুলো খুলতে চেষ্টা করি।
ধরে নিই, মাছচাষে খাদ্য পরিবর্তনের অনুপাত (FCR) ১.৭৫ । অর্থাৎ ১.৭৫ কেজি খাদ্য খাওয়ানোর ফলে ১ কেজি জীবিত বা কাঁচা মাছ উৎপন্ন হয়।
আমরা জেনেছি খাদ্যে ১০% পানি থাকে। তাই ১.৭৫ কেজি খাদ্যকে ১০০% শুষ্ক করা হলে শুষ্ক খাদ্যের নেট ওজন হয় (১.৭৫ × ৯০%) = ১.৭৫×০.৯০= ১.৫৭৫ কেজি এবং
এই শুষ্ক ১.৫৭৫ কেজি খাদ্য খাওয়াইয়ে উৎপাদিত ১ কেজি কাঁচামাছকে শুকিয়ে শুটকি করা হলে শুষ্ক মাছের ওজন ০.২৫ কেজি হয়। অর্থাৎ মাছ থেকে ৭৫% পানি বের হয়ে যায়।
অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে ১.৫৭৫ কেজি শুষ্ক খাদ্য খাওয়াইয়ে ০.২৫ কেজি শুষ্ক মাছ বা শুটকি মাছ উৎপাদন করা যায়।
অতএব দেখা যাচ্ছে শুষ্ক খাদ্য থেকে প্রাপ্ত শুষ্ক মাছের ওজন বিয়োগ করলে (১.৫৭৫- ০.২৫) মোট ১.৩২৫ কেজি খাদ্য যথাক্রমে অভুক্ত (Uneaten), মল ও বিপাকীয় বর্জ্য হিসেবে পানিতে নিঃসৃত হয়।
সহজ করে বললে ১.৫৭৫ কেজি শুষ্ক খাদ্য খাওয়ানো হলে ১.৩২৫ কেজি খাদ্য পানিতে মিশে যায়। মাত্র ০.২৫ কেজি শুষ্ক মাছ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনের জন্য যে খাদ্য প্রয়োগ করা হয় তার প্রায় ৮৪% খাদ্যই বর্জ্য হিসাবে পানিতে মিশ্রিত হয় এবং পানিকে দুষিত করে। পক্ষান্তরে মাত্র ১৬% খাদ্য মাছে রুপান্তর হয়।

বিকল্পভাবে বর্ণনা করা হলে ১.৫৭৫ কেজি শুষ্ক খাদ্যের ১০-২০% এর গড় ১৫% বা ০.২৩৬ কেজি খাদ্য অভক্ষিত(Uneaten) হিসেবে এবং
ভক্ষিত (eaten) (১.৫৭৫-০.২৩৬) ১.৩৩৯ কেজি খাদ্যের গড় ১৫% বা ০.২০১ কেজি খাদ্য মল আকারে অর্থাৎ
মোট (০.২৩৬+০.২০১) বা ০.৪৩৭ কেজি খাদ্য যথাক্রমে অভক্ষিত (Ueaten) ও মল আকারে জলাশয়ের পানিতে মিশ্রিত হয়।
অভক্ষিত (Uneaten) খাদ্য ও মাছের মল পানিতে অ্যারোবিক অবস্থায় ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপের দ্বারা পচনের ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, অ্যামোনিয়া ও ফসফেট আকারে এবং
অ্যানঅ্যারোবিক অবস্থায় হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন, ইথেন, অ্যালকোহল, অ্যাসিড ইত্যাদি আকারে পানিতে নিঃসৃত হয় এবং পানিকে দুষিত করে।
অপরদিকে মোট খাদ্য থেকে অভক্ষিত (Uneaten) ও মল (feces) হিসেবে পানিতে মিশ্রিত খাদ্য বাদ দিলে অবশিষ্ট (১.৫৭৫-০.৪৩৭) ১.১৩৮ কেজি খাদ্য মাছ পুষ্টি হিসেবে ইনটেস্টাইনের মাধ্যমে শোষণ করে এবং এর ফলে মাত্র ০.২৫ কেজি শুষ্ক মাছ পাওয়া যায়।
অবশিষ্ট (১.১৩৮-০.২৫ ) ০.৮৮৮ কেজি খাদ্যপুষ্টির কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট অক্সিজেনের সহায়তায় শ্বসন ক্রিয়ার মাধ্যমে পানিতে কার্বন ডাই অক্সাইড ও বিপাকীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রোটিন ভেঙ্গে পানিতে অ্যামোনিয়া ও ফসফেট নিঃসৃত করে পানিকে দুষিত করে।
এভাবেও হিসাব করলে দেখা যায় মোট শুস্ক ১.৫৭৫ কেজি খাদ্য জলাশয়ে প্রয়োগ করলে তা থেকে (০.৪৩৭+০.৮৮৮) ১.৩২৫ কেজি খাদ্য পচন ও বিপাকীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে পানিতে মিশে পানিকে দুষিত করছে।
অর্থাৎ এভাবে হিসাব করেও দেখা যাচ্ছে জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনের জন্য যে খাদ্য প্রয়োগ করা হয় তার প্রায় ৮৪% খাদ্য বর্জ্য হিসাবে পানিতে মিশ্রিত হয় এবং পানিকে দুষিত করে। মাত্র ১৬% খাদ্য মাছে রুপান্তর হয়।
তবে পরিমিত পরিমাণ খাদ্য প্রয়োগ করা হলে বর্জ্য হিসেবে পানিতে মিশ্রিত খাদ্য যথাক্রমে পচন, মিনারালাইজেশন ও বিপাকীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে নিঃসৃত বর্জ্য উপাদান পানিতে পুষ্টি চক্রের সৃষ্টি করে এবং জলাশয়ে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি করে ।
কিন্তু অধিক খাদ্য প্রয়োগে অধিক মাছ উৎপাদন করতে গেলে উৎপাদন বাড়ে বটে কিন্তু পানি দূষণ হয় এবং মাছের মড়ক শুরু হয়।
আবার দূষণ সহিষ্ণু জাতের মাছচাষ করা হলেও পানিতে ক্যাটাবোলাইটিক উপাদানের উপস্থিতির কারনে মাছ মারা না গেলেও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত (Growth Inhibit) হয়। ফলে FCR বেড়ে যায়, মাছচাষ অলাভজনক অথবা লোকসান হয়।
জুল প্রেস বার্ট উদ্ভাবিত শক্তির নিত্যতা বা সংরক্ষণ সূত্র অনুযায়ী শক্তি অবিনশ্বর, এর সৃষ্টি বা বিনাশ নাই। কোন বিচ্ছিন্ন বস্তু সংস্থার বা মহাবিশ্বের মোট শক্তি অপরিবর্তি থাকে। শক্তি শুধু এক রুপ থেকে অন্যরুপে রুপান্তরিত হতে পারে।
কিন্তু মাছচাষে আমরা দেখছি খাদ্যশক্তির ধ্বংস হচ্ছে অর্থাৎ খাদ্যশক্তির মাত্র ১৬% খাদ্য মাছে রুপান্তর করতে পারছি এবং বাকি মূল্যবান ৮৪% খাদ্যশক্তিই ধ্বংস হচ্ছে ও পানিকে দূষিত করছে। অর্থাৎ শক্তি ও অর্থের অপচয় হচ্ছে । আবার মাছচাষের জলাশয় দূষণরোধের ট্রিটমেন্টেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
সুতরাং মাছচাষ অধিক নিবিড়তার দিকে ধাবিত হলে এবং জলাশয়ের পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ না হলে নিবিড় ও অতিনিবিড় মাছচাষ অলাভজনক অথবা লোকসান হবে। একসময় মৎস্য উৎপাদনে মোট দেশজ উৎপাদন(জিডিপি)ও কমে যেতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় এবং অতিনিবিড় চাষ পদ্ধতি যেমন- Biofloc, RAS, IPRS মাছচাষসহ অন্যান্য পদ্ধতিগুলোকে টেকসই করতে দূষণ রোধ, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিকার, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার ও খাদ্যকে মাছে রুপান্তর হার বাড়াতে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
শক্তির অপচয়রোধে পানিতে মিশে যাওয়া ৮৪% খাদ্যশক্তিকেও মাছে রুপান্তরের হার বাড়ানোর মূল কাজ বা কৌশল উদ্ভাবন করতে পারলে মাছচাষ আরও অধিক লাভজনক হবে , সেক্ষেত্রে খাদ্যের গুণগত মান ঠিক থাকলে বর্তমান উচ্চ খাদ্য মূল্যও মাছচাষে ফ্যাক্টর হবেনা, এজন্যই প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও যথার্থ গবেষণা।
লেখকঃ আব্দুস ছালাম প্রামানিক, ঊর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্ত্ মৎস্য অধিদপ্তর ।