
ছবি : সংগৃহীত
এই প্রেক্ষাপটে, ব্রয়লারের তাপ সহনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে গাবা (গামা এমাইনোবিউটারিক এসিড) সমৃদ্ধ খাদ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, গাবা মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণে ব্রয়লারের গড় ওজন সাধারণ ব্রয়লারের তুলনায় ১২–১৫% বেশি হয়। শুধু তাই নয়, খাদ্যের রূপান্তর হার উন্নত হয় এবং গরমে সৃষ্ট হিটস্ট্রেসের লক্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যার ফলে মৃত্যুহারও হ্রাস পায়।
উষ্ণ পরিবেশে ব্রয়লার পালনের চ্যালেঞ্জ ও গাবা সমৃদ্ধ খাদ্যের সমাধান বিষয়ে গবেষণা শেষে এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. ইলিয়াছুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি “ডেভেলপিং হিট রেসিস্টেন্ট ব্রয়লারস: ইনহেনসিং পারফরম্যান্স উইথ গাবা এনরিচড ফিড” শীর্ষক গবেষণা প্রকল্পের সহযোগী গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন।
জানা যায়, ঢাকা ব্যাংক পিএলসির অর্থায়নে গত বছরের সেপ্টেম্বরে গবেষণা প্রকল্পটি শুরু হয়। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর যৌথ পরীক্ষামূলক ল্যাবরেটরি গবেষণা ও ফিল্ড ট্রায়াল গবেষণায় গাবা সমৃদ্ধ খাদ্যের সাফল্যের দাবি করেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
ড. ইলিয়াছুর রহমান জানান, ‘গাবা হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক অ্যামাইনো অ্যাসিড জাতীয় যৌগ, যা ব্রয়লারের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তাপ ও চাপ কমে গেলে মুরগির গ্রহণকৃত খাদ্যের কার্যকারিতা বাড়ে, যা দ্রুত ওজন বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখে। এর ফলে মৃত্যুহার কমে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এর স্বাদ ও গন্ধ সাধারণ ব্রয়লার মুরগির মতো নয়, বরং দেশি মুরগির মতো হয়ে থাকে। গাবা সমৃদ্ধ খাদ্যের মাধ্যমে ব্রয়লার উৎপাদের খরচও অনেক কম। গাবা পানিতে মিশিয়েও খাওয়ানো যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গাবার চকলেট পাওয়া যায়। গাবা সমৃদ্ধ খাদ্য সহজলভ্য করার জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাথে কথা চলছে, যেন খামারীরা উপকৃত হতে পারে।
গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রধান গবেষক ও শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি এন্ড টক্সিকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোছা. শরীফা জাহান লাবনী বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল- ব্রয়লার মুরগির বৃদ্ধির উপর উচ্চ তাপজনিত প্রভাব মূল্যায়ন করা, তাপ ও চাপের পরিস্থিতিতে ব্রয়লারদের তাপ স্থিতিস্থাপকতা এবং কর্মক্ষমতা উন্নত করতে গাবাসমৃদ্ধ খাদ্যের সম্ভাবনা যাচাই করা, ডোজের মাত্রা এবং বিতরণ পদ্ধতি বিবেচনা করে গাবা-সমৃদ্ধ খাদ্যের প্রণয়ন করা এবং বাণিজ্যিক ব্রয়লার উৎপাদন ব্যবস্থায় গাবা-সমৃদ্ধ খাদ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহারিক সুপারিশ প্রদান করা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের গ্রীষ্মকাল ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভাবন ব্রয়লার শিল্পে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। গাবা-সমৃদ্ধ খাদ্যের প্রসার ঘটলে দেশের মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি ও খামারিদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হবে। গাবা একটি প্রাকৃতিক অন্তঃসৃষ্ট যৌগ, যা দ্রুত বিপাকিত হয়। তাই সাধারণত এটি অবশিষ্টাংশ হিসেবে কোস বা টিস্যুতে জমা হয় না।
গাবা সমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবহার করে ব্রয়লার উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন ময়মনসিংহের খামারি আব্দুল হাই। তিনি বলেন, গত বছর তীব্র গরমে আমার খামারের তিনশ মুরগি মারা গিয়েছিল। পরে স্যারেরা আমাকে ছয়শ মুরগি দিলেন, যেগুলোতে গাবা সমৃদ্ধ খাদ্য প্রদান করা হয়। পাশাপাশি আমি কিনলাম আরও ছয়শ মুরগি। মুরগির বয়স যখন ২৫ দিন হয়ে গেল, তখন আমার অংশের মুরগি মারা যেতে শুরু করে, তবে স্যারের মুরগি একটিও মারা যায়নি। ৩০ দিনে ওজন এসেছে দুই কেজির বেশি। আগে ১ হাজার ২০০ মুরগি পালন করতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ওষধ লাগত, এখন সেই ওষুধের খরচ সাশ্রয় হয়। মুরগিগুলো যাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে তারা জানিয়েছেন স্বাদ ও ঘ্রাণে সাধারণ ব্রয়লার মুরগির চেয়ে উন্নত ছিল।
