ইলিশের টানে নদী-সাগরে ছুটছেন জেলেরা
দক্ষিণাঞ্চলের সাড়ে চার লক্ষাধিক জেলের প্রতীক্ষার প্রহর ফুরিয়েছে। মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের অভিযান শেষে নদনদী এবং সাগরে বিচরণ শুরু হয়েছে জেলেদের। গতকাল শনিবার ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা বাজতেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পরপরই নতুন স্বপ্ন নিয়ে গভীর সমুদ্রে এবং নদীতে ট্রলার ও জাল নিয়ে যাত্রা শুরু হয় তাদের।
দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা জালভর্তি ইলিশের স্বপ্ন নিয়ে গতকাল দিনভর নৌকা, জাল এবং নোঙর গুছিয়ে অপেক্ষা করছিলেন নদী এবং সাগর তীরে। রাত নামতেই জীবিকার মূল ধারায় ফেরার আগ্রহে জেলে এবং তাদের পরিবারের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের ঝিলিক। তবে যেই স্বপ্ন নিয়ে জেলেরা সাগর-নদীতে ইলিশ শিকারে যাচ্ছেন, সেই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ট্রলিং ট্রলার। জেলেরা বলছেন, ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ট্রলিং ট্রলারের কারণে কমছে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন।
মৎস্য বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, পূর্ণিমা ও অমাবস্যার ২২ দিন মা ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা ইলিশ ডিম ছাড়তে সাগরের নোনা পানি থেকে নদীর মিঠা পানিতে বিচরণ করে। এ কারণে ওই ২২ দিনকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম বলা হয়। প্রজনন মৌসুমে ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৪ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে দেশের নদনদীতে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান শুরু করে সরকারের মৎস্য বিভাগ।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে সরকারিভাবে প্রণোদনার চাল বিতরণ করে মৎস্য বিভাগ। পাশাপাশি সর্বস্তরের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে চলে অভিযান। প্রকৃত জেলেরা ইলিশ শিকার থেকে বিরত থাকলেও নিষেধাজ্ঞায় থেমে ছিল না অসাধুরা।
সরেজমিন গতকাল পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর, মহিপুর, লতাচাপলী, ধুলাসারসহ বিভিন্ন মৎস্য ঘাটে জেলেদের ব্যস্ততা দেখা গেছে। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ নৌকা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ বরফ সংগ্রহে বাজারে ছুটছেন।
আলীপুর মৎস্য আড়তদার মালিক সমিতির সভাপতি জলিল ঘরামী বলেন, ‘২২ দিন ধরে আমাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ ছিল। মধ্যরাতের পর থেকে জেলেরা সমুদ্রে নামবে। আমরাও কাজ শুরু করব। আশা করছি, এবার প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।’
জেলে আবদুল জলিল বলেন, ‘ভরা মৌসুমে ইলিশ কম পাওয়া গিয়েছিল। এরপর নিষেধাজ্ঞার সময় ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। এখন আবার সাগরে যাব, ইনশাআল্লাহ ভালো পরিমাণ ইলিশ পাব।’
আরেক জেলে রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা এনজিও থেকে টাকা নিয়ে নৌকা চালাই। মাছ না ধরলে কিস্তি দেওয়া যায় না। নিষেধাজ্ঞার সময়টা খুব কষ্টে কেটেছে। কাল (আজ) ভোরে সমুদ্রে নামব, আশা করি আশানুরূপ ইলিশ পাব।’
ভোলার মনপুরা উপজেলার জেলে আলম মাঝি আক্ষেপ করে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে নামিনি বড় মাছ পাওয়ার আশায়। কিন্তু অনেকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চুরি করে ইলিশ ধরেছে। এখন নতুন স্বপ্ন নিয়ে মেঘনায় ইলিশ শিকারে যাচ্ছি। আশা করি ভালো ইলিশ পাব, যা বিক্রি করে মানুষের দেনা এবং এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতে পারব। দাদনদারের দায় মিটিয়ে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে পারব।’
বরিশালের চরবাড়িয়া এলাকার জেলে রবিউল মুন্সি বলেন, ‘মাছ ধরাই আমাদের মূল পেশা। সারা বছর আড়তদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলতে হয় আমাদের। মাছ ধরে মহাজনের আড়তে দিয়ে দেনা শোধ করতে হচ্ছে।’ সরকার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এনজিওর কিস্তি আদায় বন্ধ এবং চালের সঙ্গে নগদ অর্থ প্রণোদনা দিলে নিষেধাজ্ঞা আরও ভালোভাবে বাস্তবায়ন হতো বলে জানিয়েছেন এই জেলে।
সমুদ্রে মাছ ধরা জেলে বরগুনার পাথরঘাটার আব্দুল জলিল মাঝি বলেন, ‘সংসারে টানাপোড়েনের মধ্যেও ২২ দিন সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেছি। এ সময় দেনা করে ট্রলার এবং জাল সংস্কার করেছি। সরকারিভাবে ২৫ কেজি চাল পেয়েছি; কিন্তু আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ জোগাতে মহাজনের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে।’
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, মা ইলিশ রক্ষায় গত বছরের তুলনায় এবার ২২ দিনে দ্বিগুণের বেশি অভিযান হয়েছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত বিভাগের ছয় জেলার নদনদীতে ৩ হাজার ৫৩১টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
মৎস্য অফিসের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, এবারে জেলেরা অনেক বেপরোয়া ছিল। তার মধ্যেও আমরা মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান সফল করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। জেলেরা নিয়ম মেনে মাছ ধরলে দেশের ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সূর্যমুখী ঘাটে দেখা মেলে ভোলার দৌলতখাঁ উপজেলার জেলে আওয়াল মাঝির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পুরো মৌসুমে ভালো মাছ পাইনি, এখনো লাভের মুখ দেখা হয়নি। নিষেধাজ্ঞার পর থেকে ঘাটে বসে আছি। প্রথম কয়েকদিন জাল ঠিক করেছি, তারপর বেকার সময় গেছে। এখন সব প্রস্তুতি শেষ, রাত ১২টার পরই সাগরে যাব।’ আওয়ালের নৌকায় আছেন ১৪ জন মাঝি-মাল্লা, সবার বাড়ি ভোলার দৌলতখাঁ এলাকায়।
একই ঘাটে এমভি মায়ের দোয়া নামের ফিশিং ট্রলারের মাঝি নুর উদ্দিন জানান, তার ট্রলারে ২২ জন মাঝিমাল্লা রয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে পাঁচবার সাগরে গিয়েও ভালো মাছ পাননি। তিনি বলেন, ‘যে মাছ পেয়েছি, শুধু বাজার খরচ মিটেছে। ঘরে টাকা পাঠাতে পারিনি। নিষেধাজ্ঞার সময় আমরা কেউ সরকারি চালও পাইনি। যারা পেয়েছে, তারা অনেকেই প্রকৃত জেলে না। এখন আবার সাগরে যাচ্ছি—এবারও যদি মাছ না পাই, তাহলে মৌসুম শেষ করে অন্য পেশায় চলে যাব।’
সূর্যমুখী ঘাট মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জবিয়ুল হক বলেন, ‘হাতিয়ার ছোট-বড় ২০টি ঘাটে প্রায় ১০ হাজার নৌকা ও ট্রলার আছে। এতে এক লাখ মানুষ মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। ২২ দিন সবাই কর্মহীন ছিল। অনেক পরিবার না খেয়ে দিন কাটিয়েছে। যদিও সরকার কিছু পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দিয়েছে, কিন্তু তা প্রকৃত জেলে সংখ্যার তুলনায় খুবই কম। মৌসুমের শুরু থেকেই মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে, তাই অনেকে দেনায় জর্জরিত।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফাহাদ হাসান বলেন, ‘হাতিয়ার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি মেনে চলেছেন। তবে পাশের কিছু এলাকা থেকে রাতের আঁধারে কয়েকজন জেলে অবৈধভাবে মাছ ধরতে চেষ্টা করেছিল। অভিযান চালিয়ে পাঁচটি ট্রলারের ৪৬ জন জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহসীন উদ্দিন জানান, মধ্যরাত থেকেই মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী নৌপথের পদ্মা-মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার এলাকায় জেলেরা নামছেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ জানান, অভিযানের দিনগুলোয় মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফলভাবে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে নদীতে টহলরতের কাজ করেছে। বিভিন্ন সময়েই অভিযানে অবৈধ জাল জব্দ করা, অসাধু জেলেদের আটক করে মামলা দায়ের ও জেল জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করছি এবার জেলেরা বড় বড় ইলিশ পাবেন।
চাঁদপুর নৌ অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান বলেন, এই অভিযানের সফলতা জেলেরাই ভোগ করবেন।
লক্ষ্মীপুরের প্রায় ১ লাখ জেলে জাল এবং নৌকা মেরামত করে প্রস্তুতি নিয়েছেন মেঘনা নদীসহ গভীর সাগরে নৌকা ভাসানোর জন্য। লক্ষ্মীপুর সদরের মজুচৌধুরীর হাট এলাকার জেলে মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের ট্রলারে ১০ জন মাঝিমাল্লা। আমরা গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করি।’
তিনি বলেন, ‘এ মৌসুমে নদী এবং সাগরে তেমন মাছ ছিল না। এখনো তেমন মাছ নাও মিলতে পারে। তাই দুশ্চিন্তায় আছি। তারপরও মাছ শিকারে নামব। সামনে শীত শুরু হলে নদীতে মাছের পরিমাণ একেবারেই কমে যাবে।’
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মতিরহাট ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী আবদুল খালেক বলেন, ‘মধ্যরাত থেকে শিকার শুরু হবে। রোববার সকাল থেকে ঘাটে মাছ বেচাবিক্রি শুরু হবে। সে জন্য ঘাটে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
