কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার দিশাবন গ্রামের একজন উদ্যোক্তা খাইরুল মাসুদ ডালিম। পেশায় তিনি একজন কন্ট্রাক্টর হলেও, তার চিন্তা ও পরিশ্রমের গণ্ডি কখনো শুধু নির্মাণ কাজে সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন কিছু করার স্বপ্ন এবং আত্মবিশ্বাসই তাকে আজ একজন সফল খামারি ও ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০১৮ সাল- খাইরুল মাসুদের উদ্যোক্তা জীবনের একটি মাইলফলক। সেই বছর তিনি মাত্র চারটি গাভী নিয়ে গবাদি পশু লালন-পালন শুরু করেন। মূল পেশার পাশাপাশি শখের বশে শুরু করা এই খামারই পরবর্তীতে তার জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। শুরুতেই তিনি আন্তরিকতা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেন, যার ফলে প্রথম বছরেই তিনি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি লাভবান হন। সফলতার প্রথম স্বাদই তাকে আরও বড় করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
ক্রমে তিনি গরুর সংখ্যা বাড়াতে থাকেন। এখন তার খামারে মোট ২৪টি গবাদি পশু রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি গাভী দুধ উৎপাদনের মাধ্যমে খামারের আয় বাড়াচ্ছে। জাতের দিক থেকেও খামারটি বেশ বৈচিত্র্যময়-৬টি ফ্রিজিয়ান, ৪টি শাহীওয়াল, ৪টি নেপালি ও কয়েকটি দেশি জাতের গরু রয়েছে। এই জাতগুলো তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বেছে নিয়েছেন। প্রতিদিন তার খামারের ৫টি গাভী ১৫-২০ লিটার করে দুধ দেয়, যা দৈনিক গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই দুধের মান উৎকৃষ্ট হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এর ভালো চাহিদা রয়েছে।
দুধ উৎপাদনের পাশাপাশি খাইরুল মাসুদ ডালিম কোরবানির ঈদে গরু বিক্রির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করে থাকেন। গত কোরবানির ঈদে তিনি একসাথে ৩০ টি গবাদিপশু বিক্রি করেছেন, যা তার খামারের জন্য একটি বিশাল অর্জন। শুধু গরুই নয়, তার খামারে বর্তমানে রয়েছে ১০টি রাজহাঁস, ২টি ছাগল এবং ৫০টিরও বেশি কবুতর। এর মাধ্যমে তিনি পশুপালনের পাশাপাশি একটি মিশ্র খামার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যা খামারের সার্বিক উৎপাদনশীলতা ও আয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
খাইরুল মাসুদ ডালিম সবসময় তার খামারের পশুগুলোর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ যত্নবান। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় তিনি গমের ভুসি, সয়াবিন ভুসি, বুটের ছোলা, চালের কুড়া, সরিষার খৈলসহ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করেন। পাশাপাশি নিজের জমিতে উৎপাদিত নেপিয়ার প্রজাতির কাঁচা ঘাস ব্যবহার করেন, যা খরচ কমায় এবং পশুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। পশুগুলো মাঝে মাঝে গ্যাস হওয়া, পাতলা পায়খানা বা বদহজমে আক্রান্ত হলেও তিনি স্থানীয় পশু চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত চিকিৎসা দেন। ফলে বড় কোনো সংক্রমণ বা মহামারি তার খামারে ছড়িয়ে পড়েনি।
খামার পরিচালনার জন্য বর্তমানে তার অধীনে ৫ জন কর্মচারী কাজ করছেন। প্রত্যেকে মাসিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতনে নিয়োজিত। খাইরুল মাসুদ তাদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনের মতো সম্পর্ক বজায় রাখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, খামারের সফলতার পেছনে কর্মচারীদের পরিশ্রম ও আন্তরিকতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবাদিপশু পালন ছাড়াও খাইরুল মাসুদ ডালিম উদ্যোক্তা হিসেবে আরও একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন- তিনি স্থানীয় ইপিজেড বাজার এলাকায় “রামিশা ডেইরি ফার্ম” নামে একটি মিষ্টির দোকান প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানেই তিনি নিজের খামার থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি দুধ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, দই ও ঘি তৈরি ও বিক্রি করেন। বাজারে তার দোকানের পণ্য এখন খাঁটি ও মানসম্মত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে তিনি শুধু পশুপালক নন, বরং একজন সম্পূর্ণ ডেইরি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এই সফলতার পেছনে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতা। অনেকেই যেখানে গবাদিপশু পালনকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, খাইরুল মাসুদ সেখানে সুযোগ দেখেছেন। তার মতে, সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত যত্ন ও বাজার সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে গবাদিপশু পালন একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হতে পারে।
আজ দিশাবন গ্রামের মানুষ তাকে অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে দেখে। তার খামার স্থানীয় তরুণদের জন্য এক প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। অনেকেই এখন তার পরামর্শ নিয়ে নতুন খামার গড়ে তুলছেন।
খাইরুল মাসুদ ডালিমের এই যাত্রা প্রমাণ করে- পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য সাফল্য কোনো স্বপ্ন নয়, বরং একটি বাস্তবতা। নির্মাণকাজের কন্ট্রাক্টর থেকে সফল গবাদিপশু খামারি ও ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্পটি আজ তার নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে সমগ্র কুমিল্লা জেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
তিনি এখন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। তার লক্ষ্য- দেশের মানুষকে খাঁটি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
খাইরুল মাসুদ ডালিমের এই সফলতার গল্প আমাদের শেখায় যে, সুযোগ সবসময় আমাদের আশপাশেই থাকে-শুধু প্রয়োজন সাহস, পরিশ্রম এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখার।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
