এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। এ খাতে বাড়তি বিনিয়োগের ফলে এখন চাহিদার চেয়েও বেশি বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাণিজ্যিকভাবে এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬-এর চূড়ান্ত খসড়ায় এ নীতি যুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী সপ্তাহের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন পেতে পারে বলে জানা গেছে।খসড়া নীতিমালায় শুধু পোলট্রি খাতের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। নীতিমালাটি অনুমোদন হলেই বোর্ড গঠনের কাজ শুরু হবে। এর মাধ্যমে পোলট্রি খাতের উন্নয়নে সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়ায় এ-সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। শুধু এক দিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে। অন্য আরেক ধারায় বলা হয়েছে, প্যারেন্ট স্টক, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানির ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে কড়াকড়ি। এ ক্ষেত্রে মানতে হবে পশুরোগ আইন ২০০৫, পশুরোগ বিধিমালা-২০০৮-এর মতো অন্তত চারটি আইন। তবে অ্যাভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা (সংক্রামক) আক্রান্ত কোনো দেশ থেকে এসব মুরগি কোনোভাবেই আমদানি করার সুযোগ থাকবে না।’মুরগির বাচ্চার উৎপাদনকারীরা জানান, দেশে এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় আড়াই কোটি বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে সাদা ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালি, কালার ব্রয়লারসহ সব বাচ্চাই রয়েছে। উৎপাদিত এই বাচ্চা সারা দেশের খামারিদের চাহিদার চেয়েও বেশি। উৎপাদন ২ কোটি বা ২ দশমিক ১০ কোটির মধ্যে থাকলে তাকে স্বাভাবিক উৎপাদন বলা যায়। এখন এর চেয়েও বেশি উৎপাদন হচ্ছে। যে কারণে ব্রিডার্স ফার্মের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি বন্ধের দাবি তুলছিলেন, যা নতুন নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দেশে আর এক দিন বয়সী বাচ্চার উৎপাদনের দরকার পড়েনি। এর মধ্যে ১০০ থেকে ১২০টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বাচ্চা উৎপাদন করছে।
আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় উৎপাদনকারীরাও। তারা বলছেন, দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পটি গড়ে উঠেছে। বাচ্চা উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তে এ খাতে বিরূপ কোনো প্রভাব পড়বে না। একই সঙ্গে জীবন্ত বাচ্চার মাধ্যমে দেশে রোগবালাই প্রবেশের ঝুঁকিও কমে যাবে।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই দেশে এক দিন বয়সী বাচ্চার আমদানি দরকার পড়ে না। কারণ আমরাই উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বরং এখন দেশেই বাচ্চার উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি।’
তবে প্রান্তিক খামারিদের সংগঠনগুলো চায় এটা উন্মুক্ত থাকুক। তাদের দাবি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একচেটিয়া বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন চাহিদা বেশি থাকে, তখন এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকায় উঠে যায়। আবার যখন চাহিদা কম থাকে, তখন এই দাম ১০ টাকাতেও নামে। কিন্তু খামারিরা যৌক্তিক দামের পক্ষে। কখনো যাতে ১০ টাকাতেও না আসে, আবার ১০০ টাকায়ও না ওঠে। এ কারণে আমদানি উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। তা না হলে এর প্রভাব গিয়ে পড়বে ভোক্তা স্বার্থের ওপর। খামারি ও ভোক্তা উভয়েই তখন ক্ষতির মুখে পড়বে। অনেক সময় নিম্নমানের বাচ্চাও সরবরাহ করে কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী বলেন, পোলট্রি শিল্প শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খামারিরা যেন সঠিক সময়ে ন্যায্য দামে বাচ্চা পান, সেটি আগে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আমদানি চালু রাখা দরকার।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, সামগ্রিক পোলট্রি খাতের উন্নয়ের লক্ষ্যেই নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে দেশের পোলট্রি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমদানি বন্ধ হলে দেখতে হবে আমাদের সংকটকালে সমস্যা তৈরি হয় কি না। এর জন্য বিকল্প কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব অংশীজনের যেন ইতিবাচক মত থাকে, সেটি অবশ্যই দেখতে হবে।’
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, এক দিনের বাচ্চা বিক্রির ক্ষেত্রে দুটি ক্যাটাগরি থাকবে ‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটাগরি মানসম্পন্ন বাচ্চা উৎপাদনের নিশ্চিত করা এবং তদারকির বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা খামারিদের ভালো মানের বাচ্চা সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো শিল্পের মানোন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ এবং খামার ব্যবস্থাপনার মানদ- নির্ধারণ করা।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পোল্ট্রি নীতিমালার মাধ্যমে পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ খাতে জাবাবদিহিতা তৈরি হবে। যা খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষা এবং খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। তবে বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করা হলে এর মাধ্যমে বড় বড় প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া বাজার গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। এ নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ ও আলোচনা চলছে। তবে দেশি শিল্প সুরক্ষায় সরকার প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তুলতে আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনে করার হচ্ছে।
সূত্র : দেশ রূপান্তর
