বাংলাদেশে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ এখন মৎস্য খাত। সরকারের নানামুখী উদ্যোগে দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও এর পেছনের কারিগর মূলত বাবুল মিয়ার মতো সাহসী উদ্যোক্তারা। কুমিল্লার কটক বাজারের এক সাধারণ যুবক থেকে সফল খামারি হয়ে ওঠার গল্পটি রূপকথার মতো মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে এক দশকের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ধৈর্য। চাকরির পেছনে সোনার হরিণের মতো না ছুটে তিনি নিজের মাটিতেই ফলিয়েছেন রূপালি ফসল। আজ তাঁর খামারের নাম শুনলেই স্থানীয়দের চোখে ফুটে ওঠে এক সফল মানুষের প্রতিকৃতি।
উদ্যোগের নেপথ্যে: কর্মসংস্থান যখন নিজেই তৈরি করলেন
২০১৪ সালের কথা। চারদিকে যখন চাকরির জন্য হাহাকার, তখন বাবুল মিয়া ভাবলেন ভিন্ন কিছু। অন্যের অধীনে কাজ না করে নিজেই একটি কর্মসংস্থান তৈরির জেদ তাঁর মাথায় চেপে বসে। শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি টেকসই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতেই তিনি মৎস্য চাষের সিদ্ধান্ত নেন। কটক বাজারের পৈতৃক জমিতে থাকা পুকুরগুলো সংস্কার করে শুরু করেন ‘বাবুল মৎস্য খামার’। শুরুর দিকে পথটা মসৃণ ছিল না, ছিল পুঁজি আর অভিজ্ঞতার অভাব। কিন্তু দমে যাননি তিনি।
খামারের পরিধি ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি
বর্তমানে বাবুল মিয়ার খামারটি ১১০ শতাংশ জমি জুড়ে বিস্তৃত, যেখানে রয়েছে ছোট-বড় তিনটি পুকুর। তিনি কেবল সনাতন পদ্ধতিতে মাছ ছাড়েন না, বরং আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তাঁর দুটি পুকুরে চলছে কার্প জাতীয় মাছের (রুই, কাতলা, মৃগেল) মিশ্র চাষ। এই পদ্ধতিতে একই পানিতে বিভিন্ন স্তরের মাছ বড় হয়, ফলে খাদ্যের অপচয় কম হয়।
অন্যদিকে, একটি পুকুর তিনি উৎসর্গ করেছেন পাঙ্গাস মাছের একক চাষের জন্য। অল্প সময়ে অধিক লাভ নিশ্চিত করতে পাঙ্গাস চাষে তিনি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। মানসম্মত পোনার জন্য তিনি কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি স্থানীয় সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার থেকে পোনা সংগ্রহ করেন। বাবুল মিয়া বিশ্বাস করেন, “পোনা যদি মানসম্মত না হয়, তবে পুরো খাটুনিই বৃথা।”
শ্রমের মূল্য ও কারিগরি ব্যবস্থাপনা
সফলতার জন্য দরকার নিবিড় তদারকি। বাবুল মিয়ার খামারে বর্তমানে একজন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন, যিনি দিনরাত পুকুরের যত্ন নেন। এ ছাড়া মাছ ধরা বা পোনা ছাড়ার মতো বিশেষ সময়ে আরও ৩ জন অনিয়মিত শ্রমিক কাজ করেন। এতে করে পরোক্ষভাবে বেশ কয়েকটি পরিবারের অন্নসংস্থান হচ্ছে তাঁর এই খামারের মাধ্যমে।
মাছের খাবারের ক্ষেত্রেও তিনি আপসহীন। প্রতিদিন নিয়ম করে মেগা কোম্পানির ফিড ও নারিশ ব্র্যান্ডের উন্নত মানের সুষম খাবার দেওয়া হয়। বাবুল মিয়ার মতে, “মাছকে সময়মতো পুষ্টিকর খাবার দিলে যেমন দ্রুত বড় হয়, তেমনি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।”
সংকট মোকাবিলা ও সরকারি সহায়তা
মাছ চাষে সবচেয়ে বড় ভয় হলো মড়ক। বাবুল মিয়ার খামারেও বিভিন্ন সময় ভাইরাস এবং ‘আরগুলাস’ বা মাছের উকুনের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। আগেকার দিনে অনেক খামারি এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে লোকসান গুনতেন। কিন্তু বাবুল মিয়া শুরু থেকেই স্থানীয় মৎস্য অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। কর্মকর্তাদের পরামর্শে সঠিক ঔষধ এবং আধুনিক ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করে তিনি মড়ক থেকে মাছগুলোকে রক্ষা করেছেন। মৎস্য দপ্তরের সাথে এই নিবিড় সমন্বয়ই তাঁকে একজন দক্ষ খামারি হিসেবে গড়ে তুলেছে।
ঈর্ষণীয় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ
বছরে বর্তমানে বাবুল মিয়ার খামার থেকে প্রায় ৮ হাজার কেজি বা ৮ টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। এই বিশাল পরিমাণ মাছ স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়। বাজারজাতকরণে তাঁর কোনো সমস্যা হয় না, কারণ খামারের তাজা মাছের জন্য পাইকাররা পুকুর পাড়েই ভিড় করেন। বছরের শেষে খরচের তুলনায় মুনাফার অংকটা বেশ ভালোই থাকে, যা তাঁকে ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।
তরুণ সমাজের জন্য বাবুল মিয়ার বার্তা
বাবুল মিয়া এখন আর কেবল একজন খামারি নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক। শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন,
”পড়াশোনা শেষ করে বেকার বসে থাকাটা অভিশাপের মতো। চাকরির পেছনে না ছুটে শিক্ষিত তরুণরা যদি আধুনিক জ্ঞান নিয়ে মাছ চাষে নামেন, তবে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মৎস্য চাষ একটি সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা। কেউ যদি আমার কাছে পরামর্শ নিতে চায়, তবে আমি নিঃস্বার্থভাবে তাঁদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সাফল্যের এই ধারা বজায় রেখে বাবুল মিয়া ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামার করার স্বপ্ন দেখছেন। আধুনিক ‘বায়োফ্লক’ বা ‘আরএএস’ পদ্ধতির মতো প্রযুক্তি যোগ করে বাণিজ্যিক মাছ চাষকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান তিনি। তাঁর এই উদ্যোগ কেবল তাঁর নিজের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটায়নি, বরং কুমিল্লার মৎস্য খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সবশেষ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর আঞ্চলিক অফিস কুমিল্লার পক্ষ থেকে উক্ত খামারিকে তথ্য দপ্তর কর্তৃক মুদ্রণ সামগ্রী সংশ্লিয়ে বিষয়ের বিনামূল্যে প্রদান করা হয়
