বর্তমান সময়ে দেশের শিক্ষিত ও উদ্যোগী তরুণদের কাছে মাছ চাষ একটি লাভজনক পেশা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনই একজন সফল উদ্যোক্তা কুমিল্লার পাথুরিয়া পাড়া এলাকার মাসুক মিয়া। তাঁর কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা ‘মাসুক মৎস্য খামার’ এখন পুরো এলাকায় সফলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০১৮ সালে যে স্বপ্নের বীজ তিনি বুনেছিলেন, আজ তা থেকে বছরে ১৫ টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে।
বেকারত্ব জয় ও উদ্যোগের শুরু
২০১৮ সালের কথা। যখন চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, তখন মাসুক মিয়া চিন্তা করলেন ভিন্ন কিছু করার। পারিবারিকভাবে বা শখের বশে নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক চিন্তা থেকেই তিনি মৎস্য খাতে পদার্পণ করেন। পাথুরিয়া পাড়ায় নিজের জমিতে গড়ে তোলেন মৎস্য খামার।
খামারের চিত্র ও বৈচিত্র্য
বর্তমানে মাসুক মিয়ার খামারে ১২০ শতক আয়তনের দুটি বিশাল পুকুর রয়েছে। যেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। খামারটিতে রয়েছে বৈচিত্র্যময় মাছের সমাহার। একদিকে যেমন রুই, কাতলা, মৃগেলের মতো কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র চাষ হচ্ছে, অন্যদিকে তিনি সাহসিকতার সাথে ৬০ শতাংশ এলাকায় এককভাবে চাষ করছেন সুস্বাদু টেংরা মাছ।
উন্নত জাতের পোনা নিশ্চিত করাকে তিনি সাফল্যের মূল চাবিকাঠি মনে করেন। এজন্য তিনি স্থানীয় উৎস থেকে পোনা না কিনে প্রতি বছর ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি উন্নত জাতের পোনা সংগ্রহ করেন।
শ্রম ও ব্যবস্থাপনা
একটি খামার চালানো মানে কেবল পুকুরে পোনা ছাড়া নয়, এর পেছনে রয়েছে নিরলস শ্রম। মাসুক মিয়ার খামারে বর্তমানে ২ জন স্থায়ী কর্মচারী কর্মরত আছেন, যাঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ১৮ হাজার টাকা। তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে যখন কাজের চাপ বেড়ে যায়, তখন তিনি আরও বাড়তি নিয়মিত কর্মচারী নিয়োগ দেন। এতে স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মাছের পুষ্টির জন্য তিনি কোনো আপস করেন না। বাজারজাত করা ভালো মানের খাবারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। প্রতিদিন খামারে বিখ্যাত মেগা কোম্পানির উন্নত মানের ফিড প্রদান করা হয়, যা মাছের দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ
মাছ চাষে রোগবালাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাসুক মিয়ার খামারেও আরগুলাস (মাছের উকুন) এবং ভাইরাসের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে তিনি কখনো বিচলিত হননি। তিনি নিয়মিত স্থানীয় মৎস্য অফিসের সাথে যোগাযোগ রাখেন। মৎস্য কর্মকর্তাদের বৈজ্ঞানিক পরামর্শ ও সঠিক ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি দ্রুত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর এই নিবিড় সমন্বয় খামারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।
বাজারজাতকরণ ও লক্ষ্য
মাসুক মিয়ার খামারের সুস্বাদু মাছের চাহিদা রয়েছে স্থানীয় বাজারেও। প্রতিদিন মাছ ধরার পর সেগুলো স্থানীয় পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এবং পঞ্চম ব্রিজ মাছ বাজারের আড়তগুলোতে পৌঁছে যায়। বছরে বর্তমানে ১৫ টন মাছ উৎপাদন করছেন তিনি, যা স্থানীয় প্রোটিন চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সাফল্যের এই চূড়ায় দাঁড়িয়েও মাসুক মিয়া থেমে থাকতে চান না। তিনি জানান, সামনে তাঁর লক্ষ্য আরও বড়। তিনি আরও বিশাল পরিসরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের পরিকল্পনা করছেন।
কুমিল্লা এলাকার মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, মাসুক মিয়ার মতো উদ্যোক্তারা মৎস্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে স্থানীয় অনেক বেকার তরুণ এখন মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
সবশেষ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর আঞ্চলিক অফিস কুমিল্লার পক্ষ থেকে উক্ত খামারিকে তথ্য দপ্তর কর্তৃক মুদ্রণ সামগ্রী সংশ্লিয়ে বিষয়ের বিনামূল্যে প্রদান করা হয়
বছরে উৎপাদন ১৫ টন মাছ
৪৪
previous post
