কুমিল্লা জেলার লালামাই উপজেলার আশকামতা গ্রামের এক পরিচিত মুখ মো. আবুল হাসান। গ্রামবাসীর কাছে তিনি যেমন একজন সফল খামারী, তেমনি একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবেও সমানভাবে সম্মানিত। দিনের একাংশ কাটে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে, আর বাকি সময়টা নিবেদিত থাকে তার প্রিয় খামারে।
২০০৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে খামারের যাত্রা শুরু করেন। তবে খামারের প্রতি ভালোবাসার বীজ রোপিত হয়েছিল আরও অনেক আগে, শৈশবে। ছোটবেলায় তিনি দেখতেন তার বাবা যত্ন করে গরু পালন করছেন। বাবার সেই নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর ধৈর্য তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। বাবার হাত ধরে গরুর দেখাশোনা শেখা ছোট্ট আবুল হাসান একসময় নিজেই হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ খামারী।
বর্তমানে তার খামারে পাঁচটি গরু রয়েছে। সবগুলোই হলেস্ট্রাইন ফ্রিজিয়ান জাতের-উন্নত জাতের এই গরুগুলো বেশি দুধ দেয় বলে তিনি এই জাতকেই বেছে নিয়েছেন। তার খামারটি মূলত একটি পারিবারিক খামার। তিনি ও তার স্ত্রী মিলে গরুগুলোর দেখাশোনা করেন। ভোরের আলো ফুটতেই তাদের দিন শুরু হয়। গরুগুলোকে পরিষ্কার করা, খাবার দেওয়া, গোয়ালঘর পরিষ্কার রাখা-সবকিছুতেই থাকে যত্ন আর ভালোবাসার ছোঁয়া।
খাবারের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন। তার বিশ্বাস, সঠিক খাবারই সুস্থ গরু ও ভালো দুধের মূল চাবিকাঠি। তাই তিনি প্রচুর পরিমাণে সবুজ ঘাস, বিশেষ করে নেপিয়ার জাতের ঘাস খাওয়ান। পাশাপাশি খৈল, কুঁড়া, ভূষি ও খড়ও নিয়মিত দেন। তিনি নিজেই খেয়াল রাখেন যাতে খাবারের পরিমাণ ও গুণগত মান ঠিক থাকে। তার মতে, গরুকে যদি পরিবারের সদস্যের মতো যত্ন করা যায়, তাহলে তার ফলও ভালোই পাওয়া যায়।
প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে গরু দোহন করা হয়। সেই দুধ তিনি বাগমারা বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে বিক্রি করেন। তার দুধের গুণমান ভালো হওয়ায় দোকানদাররাও সন্তুষ্ট। নিয়মিত দুধ সরবরাহের মাধ্যমে তিনি একটি স্থায়ী ক্রেতা গড়ে তুলেছেন, যা তার খামারের আর্থিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গরু অসুস্থ হলে তিনি কখনো অবহেলা করেন না। সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেন। চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলেন কঠোরভাবে। তার মতে, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা দিলে বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
মাদ্রাসার শিক্ষকতা ও খামার-দুই দায়িত্বই তিনি সমান আন্তরিকতায় পালন করেন। শিক্ষার্থীদের তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেন না, বরং পরিশ্রম, আত্মনির্ভরশীলতা ও সততার শিক্ষাও দেন। নিজের জীবন দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে ছোট পরিসর থেকেও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব।
আশকামতা গ্রামের মানুষ আজ তাকে একজন পরিশ্রমী ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে জানে। তার গল্প শুধু একজন খামারীর গল্প নয়, এটি একজন স্বপ্নবাজ মানুষের গল্প-যিনি বাবার স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে নিজের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন এক আলোকিত পথ।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
