
তরিকুল ইসলাম সুমন, ঢাকা: ডিম ছাড়ার মৌসুমে সাগর থেকে নদীপথে উজানে উঠে আসে মা ইলিশ। ডিম ছেড়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। সাগর থেকে নদী, আর নদী থেকে সাগরে ইলিশের চলাচলের এই পথ (মাইগ্রেটরি রুট) ভরাট হচ্ছে পলি জমে; সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। এতে ইলিশ আর উজানে এগোতে পারছে না, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রজনন। এই সংকট কাটাতে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় প্রায় ২০ কিলোমিটার নদী খননের জন্য নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই বিশাল ড্রেজিং কার্যক্রমে প্রাথমিক ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ইলিশের জীবনচক্রে এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর বুকে জেগে ওঠা অন্তত ২৫টি চর। বিশেষ করে চাঁদপুরের মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় তৈরি হওয়া এসব চরে প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে। নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ৫ থেকে ১০ মিটার (১৫ থেকে ৩০ ফুট) থাকার কথা থাকলেও পলি জমার কারণে এখন তা কমে কোথাও কোথাও ২ থেকে ৩ মিটার হয়েছে।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ‘ইলিশের চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ মিটার গভীর পানি দরকার। কিন্তু মোহনার পথে পলি পড়ে ভরাট হয়ে পানির গভীরতা কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মিটার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব রুট খননের জন্য অনুরোধ জানিয়ে দুটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের জানিয়েছে, শুধু মেঘনার ৫০ কিলোমিটার এলাকার মোহনায় কোটি কোটি ঘনমিটার পলি জমে আছে। এগুলো ড্রেজিং করার জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন। তবে আমরা আমাদের প্রস্তাবনায় এখন দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ২০ কিলোমিটার নদী খননের বিষয়টি উল্লেখ করেছি।’
তবে ড্রেজিংয়ের কথা বলা হলেও এ বিষয়ে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি বলে জানান মোল্লা এমদাদুল্যাহ। এ জন্য সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং মৎস্য বিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না। ড্রেজিংয়ের সুফল-কুফল বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে অবস্থা খারাপও হতে পারে। ইলিশ মাছ গভীর সাগর থেকে ভোলার মেঘনা নদী দিয়ে প্রবেশ করে তেঁতুলিয়া ও পদ্মাসহ বিভিন্ন নদীতে যায়। আর দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন হয়ে থাকে ভোলায়। ইলিশ যখন সাগর থেকে ভোলা উপকূলের মেঘনা নদীতে প্রবেশ করতে গিয়ে ডুবোচরে বাধাগ্রস্ত হয় তখন দিক পরিবর্তন করে ফের সাগরের দিকে চলে যায়।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় জমে থাকা পলি অপসারণসহ ড্রেজিং করার জন্য গত বছরের ৯ জুলাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ চিঠিতে ইলিশের প্রজননের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিকে ড্রেজিংয়ের জন্য যে চিঠি দিয়েছে তাতে ইলিশের মাইগ্রেটরি চারটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মেঘনা নদীর মোহনা (ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালী) জেলার চর ফ্যাশন, রাঙাবালী, হাতিয়া ও সন্দ্বীপ উপজেলার সোনার চর দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ২০ কিলোমিটার ড্রেজিং করতে হবে। এসব এলাকা দিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ ইলিশ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ডিম ছাড়ার জন্য। বিশেষজ্ঞরা জানান, এক্ষেত্রে ২০ কিলোমিটার ৭ মিটার গভীর করে পলি অপসারণে ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। অপসারণ করতে হবে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টন পলি। (১ ঘনমিটার = ১.৭ টন এবং প্রতি ঘন মিটার ১৭০ টাকা হিসেবে)।
একইভাবে তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় পটুয়াখালী রাঙাবালী উপজেলার চর হেয়ার (কলাগাছিয়া নামে পরিচিত) এর মোহনা দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ড্রেজিংয়ে খরচ হবে ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে ২৩ কোটি ৮০ লাখ টন পলি। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদীর মোহনা থেকে ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করার কথা বলা হয়েছে। এখানে ১০ কিলোমিটার নদী খননে ব্যয় হবে ৮৩৩ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি।
সর্বশেষ মেঘনা নদী (বরিশাল, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলা) হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হাইমচর ও রায়পুর উপজেলার নদীর অংশ ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ৮৩৩ কোটি টাকা। অপসারণ করতে হবে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি। তবে নদী গবেষকরা বলেন, ‘মেঘনা নদী খননের পরে আগের অবস্থায় আসতে দুই বছর এবং তেঁতুলিয়া নদী পাঁচ বছরের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। এ কারণে খনন করে রেখে দিলে হবে না, প্রতিবছর এসব নদী সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং করতে হবে। তা না হলে নদী খনন কোনো কাজেই আসবে না।’
নদী ড্রেজিং করা প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. রকিবুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো নৌযান চলাচল উপযোগী রুটগুলো সচল রাখা। সাধারণত এ রুটে ৭৫ মিটার প্রস্থ ও চার মিটার গভীরতার নৌপথ খনন করি । তারপরও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা উল্লিখিত নদী ড্রেজিং করার বিষয়ে একটি আলোচনা সভা করেছি। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাইগ্রেটরি রুট ড্রেজিং করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে শুধু তেঁতুলিয়া নদীর ড্রেজিংয়ে আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এ নদী অন্য নদীর তুলনায় বেশি সিল্টেশন হয়ে থাকে। দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না, একে সারা বছর সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং করতে হবে।’ তিনি মনে করেন, ড্রেজিং করে এ পথ সংরক্ষণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে সরকারি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহায়তা পেলে তারা ইলিশের গতিপথগুলোতে থাকা ডুবোচর অপসারণের উদ্যোগ নেবেন।
এ বিষয়ে সদ্য সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, ‘ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। ডলফিন রক্ষার মতোই ইলিশ রক্ষাও একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ হওয়া উচিত। ইলিশের মাইগ্রেশন রুটে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
