গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরে গরুর খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন মো. নাজিম মুন্সি। ‘ফাহাদ এম ফার্ম’ নামে তার এই খামার এখন এলাকায় সফল উদ্যোক্তার উদাহরণ। ২০১৭ সালে ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন নাজিম। সেখানে ইউটিউবে গরুর খামার গড়ে তোলার ভিডিও দেখে অনুপ্রেরণা পান। ২০২২ সালে দেশে ফিরে পরের বছরই সালে মাত্র পাঁচটি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। এতেই বাজিমাত করে বসেন; প্রথম বছরেই লাভের মুখ দেখেন নাজিম। এরপর ধাপে ধাপে খামারের পরিসর বাড়ান তিনি। এক পর্যায়ে তার গরুর সংখা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮টি। এর মধ্যে তিনটি রমজানের ঈদে বিক্রি করেছেন। আর বাকি ১৫টি কোরবানির ঈদের জন্য প্রস্তুত করেছেন।এ বছর প্রায় ১০ লাখ টাকা আয়ের আশা ৩৮ বছর বয়সী যুবক নাজিমের। নাজিম মুন্সি বলছিলেন, “বিদেশে মাসে এক লাখ টাকা আয়ের চেয়ে দেশে ৮০ হাজার টাকা আয় করা অনেক আরামের। বিদেশের কষ্টকর পরিশ্রমের তুলনায় দেশে তিন ভাগের দুই ভাগ শ্রম দিলেই দ্বিগুণ সাফল্য পাওয়া সম্ভব।” সরেজমিনে দেখা গেছে, নাজিম মুন্সির সংগ্রহে থাকা গরুগুলো উচ্চতা ও ওজনে বেশ নজরকাড়া। খামারের অধিকাংশ গরুই ৭ ফুট লম্বা এবং ৫ ফুট উচ্চতার। কোনোটির ওজন ১৪ থেকে ১৫ মণ, আবার কোনোটির ১০ থেকে ১২ মণ। নাজিমের খামারে ‘শাহীওয়াল’, ‘গির’ ও ‘ব্রাহামা’ জাতের গরুর দেখা মেলে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে কাঁচা ঘাস, খড় ও ভুসি খাইয়ে কোনো ধরনের ক্ষতিকর হরমোন ছাড়াই গরুগুলো লালন-পালন করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি নিজেই খামারের দৈনন্দিন কাজে সরাসরি যুক্ত থাকেন। বর্ণি গ্রামের আবুল হোসেন মিয়া বলেন, “বিদেশ থেকে ফিরে চার বছর ধরে গরু মোটাতাজা করে আসছেন নাজিম। তিনি সাধারণত মাঝারি আকৃতির গরু মোটাতাজা করেন। কোরবানির বাজারে এ ধরনের গরুর চাহিদা বেশি।
“তার খামারের গরু অনেক সময় খামারেই বিক্রি হয়ে যায়। কোনো বছরই গরু অবিক্রিত থাকে না। খামার করে নাজিম পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে জীবনযাপন করছেন।” গওহরডাঙ্গা গ্রামের শফিক শিমুল বলেন, “শ্রম ও মেধাকে যুগলবন্দী করে নাজিম অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাকে অনুসরণ করে বেকার যুবকরা কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে সাবলম্বী হতে পারেন।”সরকারি সহায়তা পেলে খামারটি আরও বড় করার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন খামারি নাজিম মুন্সি। তিনি বলেন, “ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরুগুলোকে বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছি। উপযুক্ত দাম পেলে এবার কোরবানির মৌসুমে গরুগুলো বিক্রি করে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করতে পারব বলে আশা করছি।” টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, “কোরবানি ঈদ সামনে রেখে এ বছর এ উপজেলার ১ হাজার ৩৮ জন খামারি ৪ হাজার ২৩৯টি পশু প্রস্তুত করেছে। এ উপজেলায় ৪ হাজার ১২২টি পশুর চাহিদা রয়েছে; উদ্বৃত্ত রয়েছে ১১৭টি পশু। এসব পশু বাজারজাত করতে আমরা খামারিদের পরামর্শ দিচ্ছি।” ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আমরা খামারিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, পশু চিকিৎসাসেবা, ভ্যাকসিন ও কৃমিনাশক দিয়ে থাকি। পাশাপাশি খামার তদারকি করি। স্টেরয়েড বা অপদ্রব্য প্রয়োগ থেকে খামারিদের নিরুৎসাহিত করি। আমরা সরাসরি ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করি না। তবে কোনো খামারির ঋণের প্রয়োজন হলে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুপারিশ করি।” গোপালগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গোবিন্দ চন্দ্র সরদার বলেছেন, “গরু মোটাতাজাকরণ একটি লাভজনক উদ্যোগ, যা স্বল্প পুঁজি ও তুলনামূলক কম পরিশ্রমে করা সম্ভব। সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে নাজিম মুন্সি গ্রামের বাড়িতে গরুর খামার গড়ে তোলেন, যা এখন একটি সফল দৃষ্টান্ত। আমি নিজে খামারটি পরিদর্শন করেছি এবং শুরুতে পাঁচটি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে প্রতি বছরই খামারে গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, “খামারি নাজিমকে নিয়মিত গরু পালনের পরামর্শ, একাধিক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার খামারে কারিগরি সহায়তা ও নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রয়েছে। নাজিম একজন সফল ও অনুকরণীয় খামারি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। প্রতি বছরই তিনি গরু বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সব সময় অনুপ্রেরণা দেওয়া হচ্ছে এবং নতুনদেরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, “নাজিমের মতো খামারিদের অনুসরণ করে যদি নতুন প্রজন্ম এই লাভজনক খাতে যুক্ত হয়, তাহলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
