২৩ মার্চ ২০২৫ খ্রি.
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার শাকতলা গ্রামের খোকন মিয়া এখন একজন সফল গবাদিপশু খামারি। চার বছর আগে তিনি যখন খামারটি শুরু করেন, তখন তার হাতে ছিল শুধু ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা খোকন মিয়া প্রথম থেকেই নিজের আত্মকর্মসংস্থানের কথা ভাবতেন। চাকরির পিছনে না ছুটে তিনি সিদ্ধান্ত নেন গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার। শুরুতে চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধাপে ধাপে তিনি এগিয়ে গেছেন।
শুরুর দিকে গরু কেনার জন্য পুঁজি জোগাড় করা সহজ ছিল না। তিনি নিজের সঞ্চিত টাকা বিনিয়োগ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নেন। এছাড়া প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নিয়ে খামারের উন্নয়ন শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ১০টি উন্নত জাতের গবাদিপশু রয়েছে, যার মধ্যে ফ্রিজিয়ান, শাহীওয়াল ও ব্রাউন সুইস জাতের গরু রয়েছে। তিনি ও তার স্ত্রী মিলে এই খামার পরিচালনা করেন।
তার খামারের দুটি গাভী প্রতিদিন ১০-১২ লিটার দুধ দেয়। এই দুধ বিক্রি করেই তাদের সংসার চলে। স্থানীয় বাজারে দুধের ভালো চাহিদা থাকায় তা দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। খোকন মিয়া গরুর খাদ্যের জন্য নিজ জমিতে কাঁচা ঘাস চাষ করেন। এতে খরচ কিছুটা কম হয় এবং গরুর পুষ্টি নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি তিনি খৈল, ভুসি, চালের কুঁড়া ও খড় খাওয়ান, যা গরুর স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং দুধ উৎপাদন বাড়ায়।
খামার পরিচালনায় মাঝে মাঝে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। গরুগুলো কখনো লাম্পি, পেট ফাঁপা কিংবা চোখ ওঠার মতো রোগে আক্রান্ত হয়। তবে তিনি নিয়মিত প্রাণিসম্পদ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করান। সরকারি প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে বিনামূল্যে টিকা ও পরামর্শ পাওয়ার কারণে সহজেই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেন। ফলে তার গরুগুলো সুস্থ থাকে এবং দুধ উৎপাদন ভালো হয়।
খামার পরিচালনার মাসিক খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা হলেও খোকন মিয়া মনে করেন এটি লাভজনক একটি উদ্যোগ। তার চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই খামার। প্রতি বছর কোরবানি ঈদে তিনি গবাদিপশু বিক্রি করেন, যা তার জন্য বাড়তি আয় নিশ্চিত করে।
ভবিষ্যতে তিনি খামারটি আরও বড় করতে চান। তিনি উন্নত জাতের গরু কেনার পরিকল্পনা করেছেন, যাতে দুধ উৎপাদন বাড়ানো যায়। এছাড়া, দুধ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি ইউনিট গড়ে তোলারও ইচ্ছা আছে, যাতে দুধের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় এবং দুধ অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়।
খোকন মিয়া তার পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ও নিয়মিত পরিচর্যা করলে খামার থেকে ভালো আয় করা সম্ভব। তার সফলতার গল্প আশপাশের মানুষদেরও অনুপ্রাণিত করছে। অনেকেই এখন তার কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন এবং নিজেরাও খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন।
সম্প্রতি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা আঞ্চলিক অফিস থেকে দুজন কর্মচারী তার খামার পরিদর্শন করেছেন। তারা খামারের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করেন।
খোকন মিয়ার মতো উদ্যোক্তারা শুধু নিজেদের জন্যই নয়, বরং দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে তিনি আরও বড় পরিসরে খামার পরিচালনা করতে পারবেন এবং দেশে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারবেন।
প্রতিবেদনকারী :
খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা
