নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, জেলে ও চাষিদের ছোট ছোট উদ্যোগে দেশে প্রতিবছর বাড়ছে মাছের উৎপাদন। পাঁচ বছরে দেশে এর উৎপাদন বেড়েছে সাত দশমিক ৪১ লাখ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৪২ দশমিক ৭৭ লাখ টন। ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টনে। উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আহরণ করা এসব মাছের বেশির ভাগই দেশি প্রজাতির। এদের পুষ্টিমানও বেশি। কিন্তু ধারাবাহিক দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ, আগ্রাসী প্রজাতির বিদেশি মাছের বিচরণ, কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে দেশি মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দেশের নদী, হাওর, বিল ও সামুদ্রিক জলাশয়ে একসময় প্রাচুর্য থাকা দেশি মাছের সংখ্যা কমে আসছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) আয়োজিত ‘টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভয়াশ্রমের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। গতকাল বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে এ সেমিনার হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। সেমিনারে গবেষক, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে দেশি মাছের বহু প্রজাতি অদূরভবিষ্যতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বিএফআরআইর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান প্রাকৃতিক উৎসের মাছের বেশ কিছু ঝুঁকি চিহ্নিত করার কথা জানান। এতে বলা হয়, মাছের বিচরণ এলাকা নদী, হাওর-বাঁওড় ও বিল দূষিত হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদী, হাকালুকি হাওর, পদ্মা নদীসহ দেশের অভায়শ্রম ও জলাশয় প্রায় মাছশূন্য হতে চলেছে। এ ছাড়া তিনটি আগ্রাসী প্রজাতির বিদেশি মাছ আফ্রিকান ক্যাটফিশ, সাকার ফিশ ও অ্যালিগেটর উইড ঢুকে পড়েছে, যা দেশি ছোট মাছগুলোকে খেয়ে সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। দেশের কৃষিকাজে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ টন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হয়, যা মাটি চুইয়ে জলাভূমিতে যায়। এর কারণে মাছের উৎপাদন কমছে। এ ছাড়া ধারাবাহিক দূষণ ও পলি পড়ে নদী ভরাট হওয়ায় মাছের বিচরণ কমে আসছে।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, দেশের প্রধান নদী ও মোহনায় ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের ডিম ছাড়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, বাঁধ নির্মাণ ও দূষণের কারণে এক সময়কার সমৃদ্ধ প্রজনন ক্ষেত্র ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ইলিশসহ বহু দেশি মাছের প্রজনন সংকটে পড়েছে।
শিল্পবর্জ্য, কৃষিজ কীটনাশক ও অপরিশোধিত বর্জ্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে নদী-নালা ও হাওরে ফেলা হচ্ছে। সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেটের মাত্রা ৮০ মিলিগ্রাম/লিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের (৫০ মিলিগ্রাম/লিটার) চেয়ে অনেক বেশি। কিছু জলাশয়ে সিসার মাত্রা ১.২ পিপিএম, যেখানে অনুমোদিত সীমা মাত্র ০.১ পিপিএম। পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের বহু এলাকায় দেশি মাছ টিকতে পারছে না।
বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন প্রকট। পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধির সময়সূচি পাল্টে যাচ্ছে। সেমিনারে বলা হয়, পানির তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে মাছের মৃত্যু দ্রুত বেড়ে যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে। নদীনালায় পানির স্তরবিন্যাস পাল্টে গিয়ে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ফলে মাছের প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে।
অতিরিক্ত আহরণকে বিশেষজ্ঞরা মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। সেমিনারে দেশি মাছ রক্ষায় নদী ও প্রজনন ক্ষেত্র খনন ও পুনঃখনন করে মাছের আবাসস্থল ফিরিয়ে আনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণে শিল্পকারখানা ও কৃষিতে কঠোর পরিবেশনীতি বাস্তবায়ন, নদী ও হাওরে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণ, পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি ও কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং দেশি মাছ সংরক্ষণে জেনেটিক গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ দিন দিন কমছে, ফলে মাছের প্রজাতি জিনগত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। একসময় ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছিল। গবেষণার মাধ্যমে তার মধ্যে ৪১ প্রজাতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। জলাশয় চিহ্নিত করে দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করতে হবে। মাছ শিকারে বিষ ও বিদ্যুতের ব্যবহার এবং পানিদূষণ ও প্লাস্টিক দূষণকে তিনি মৎস্যসম্পদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, আইন সংশোধনের ফলে এখন মন্ত্রণালয় নিজেই অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে পারবে। অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে শুধু মাছ নয়, পুরো জলজ প্রতিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ফারাহ শাম্মী বলেন, কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। তাই সেখানে দ্রুত অভয়াশ্রম গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুর রউফ জানান, অভয়াশ্রমের ফলে হাকালুকি হাওরে মাছের উৎপাদন বেড়েছে। সাগরে ৫৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখায় পাঙ্গাশসহ অন্যান্য মাছের প্রজননও বেড়েছে।
সভায় বিএফআরআইর মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র বলেন, মাছ শুধু আমিষের উৎস নয়, বরং বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে ইলিশসহ দেশি মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
