গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ডুমনি বিলের পাড়ে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমধর্মী হাঁসের খামার। বিলের ভাসমান পানিতে গড়ে ওঠা এই খামারের উদ্যোক্তা ২৫ বছর বয়সি তাপস নামের এক যুবক, যিনি বর্তমানে হাঁস পালন করে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। নিরলস পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাসই তার এই সাফল্যের পেছনের মূল শক্তি। তাপস প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ডুমনি গ্রামের ননী গোপালের ছেলে। পড়াশোনায় আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বেশিদূর এগোতে না পারলেও জীবন থেমে থাকেনি তার। ২০১২ সালে মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকায় গিয়ে একটি কারখানায় চাকরি নেন। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় চাকরি হারিয়ে ফের বেকার হয়ে পড়েন। পরিবারের সবাই সিদ্ধান্ত নেন তাকে বিদেশে পাঠানোর, তবে প্রবাসে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৬ লাখ টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। তাপস নিজেও এত টাকা খরচ করে বিদেশে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। বরং সেই অর্থ দিয়ে দেশে কিছু করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল, সেই আগ্রহ থেকেই শুরু করেন হাঁস পালন। ২০২১ সালে মাত্র দেড় হাজার টাকা দিয়ে ৩২ টি খাকি ক্যাম্পবেল জাতের হাঁস কিনে বাড়িতেই খামার শুরু করেন। হাঁস পালনের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও ইউটিউব দেখে দেখে শিখতে থাকেন সবকিছু। একসময় তার ছোট খামারটি বড় হতে শুরু করে। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি হাঁস। প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২৫০টি ডিম, যা স্থানীয় পাইকাররা বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যান।
তাপসের খামারটি নির্মাণ করা হয়েছে ডুমনি বিলে। বিলের উন্মুক্ত পানিতে হাঁস ছেড়ে দেওয়া হয়, রাতে রাখা হয় পাশেই টিন ও বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি ঘরে। অল্প জায়গায় কম খরচে খামার পরিচালনা করেই নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন তিনি। তাপস বলেন, সত্যি বলতে এখন লাভ খুব বেশি না, খরচ আর ঝুঁকি দুটোই আছে। হাঁস অসুস্থ হলে অনেক মারা যায়। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে খামার গড়ে তোলা সম্ভব।তাপস এখন শুধু নিজের পরিবারই চালাচ্ছেন না, বরং একজন অনুপ্রেরণাদায়ী সফল খামারি হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন এলাকায়। তাপসের মাতা সবিতা রানী দাস বলেন,প্রথমে আমরা তাকে খামার করতে বারন করেছিলাম। কিন্তু সে আমাদের কাছে একটিবারের জন্য সুযোগ চেয়েছে।সে নিজের চেষ্টায় আজ এতদুর এসেছে। আমরা এতে গর্বিত। স্থানীয় এক উদ্যোক্তা শেখ ফরিদ বলেন, তাপস আমাদের যুবকদের জন্য এক দৃষ্টান্ত। শিক্ষিত বেকার যুবকরা যদি তাপসের মতো করে চিন্তা করতো, তাহলে চাকরির জন্য হাহাকার কমে যেত। বরং এরকম খামার গড়ে নিজেরাই বেকারত্ব দূর করতে পারত।তাপসের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, ইচ্ছা থাকলে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন। শুধু দরকার সঠিক সিদ্ধান্ত আর অধ্যবসায়। এবিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা ডা: আশরাফ হোসেন বলেন, তাপসের মতো উদ্যোক্তারা আসলেই বেকারদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে তাকে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সে চাইলে হাঁসের ভ্যাকসিন, প্রশিক্ষণ ও আরও বড় আকারে খামার গড়ে তুলতে প্রণোদনার আওতায় আনা সম্ভব। আমাদের দরজা সবসময় তার মতো উদ্যোক্তাদের জন্য খোলা রয়েছে ।
