দারিদ্র্য কখনো কখনো মানুষের সুপ্ত স্বপ্নগুলোকে আচমকা বন্দি করে ফেলে, যখন অভাবের নির্মম কষাঘাত একটি পরিবারকে প্রতিনিয়ত ঠেলে দেয় হতাশার অতল গহবরে। ঠিক তেমনই এক নিকষ অন্ধকারকে পদদলিত করে টেকনাফের উপকূলীয় জনপদে আজ এক চিরবঞ্চিতা নারী, নিজের মেধা ও বিন্দু বিন্দু ঘামের বিনিময়ে রূপান্তরিত করেছেছেন সফল খামারিতে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাজাড়ছড়া গ্রামের গৃহিণী রুবি রানী (৩৪) এখন সেই অনুপ্রেরণারই এক উজ্জ্বল প্রতীক। রুবি রানীর জীবন শুধু সাফল্যের গল্প নয় এটি এক মায়ের চোখের জল থেকে জেগে ওঠা বিজয়ের কাব্য।
তাঁর গড়ে তোলা ছাগল খামারের প্রতিটি সাফল্য যেন বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কষ্টের বুকে এক সুতীব্র আলোর প্রজ্জ্বলন। নিজের ভাগ্যলিপি পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজের আরও দশটি নিভু নিভু পরিবারের ঘরে স্বাবলম্বীতার মশাল জ্বেলে দেওয়ার এই অলৌকিক রূপান্তর যেন চরম জঠরাগ্নিকে জয় করে এক শাশ্বত নারী শক্তির জীবন্ত জয়গাথা।
অভাবের সেই দুঃসহ দিনগুলো কয়েক বছর আগেও রুবি রানীর দিন কাটত এক বুক হাহাকার আর অনিশ্চয়তায়। স্বামী ছিলেন একজন ভাগ্য বিড়ম্বিত দিনমজুর। তাঁর ঘাম ঝরানো সীমিত আয়ে তিন কন্যাসন্তান সহ পাঁচ সদস্যের সংসারে দুমুঠো অন্ন সংস্থান করাই যেখানে ছিল আকাশকুসুম কল্পনা, সেখানে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা আর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা ছিল দূরহ বিলাসিতা। ভবিষ্যৎ বলতে ছিল শুধু অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া।
তার স্বামী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, একসময় ছেলেমেয়েদের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়াই ছিল কঠিন সংগ্রাম। আজ স্ত্রীর পরিশ্রম আর সাহসে আমাদের ঘরে হাসি ফিরেছে। আমি গর্বিত।
২০২৩ সালে রাজাড়ছড়া ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট কমিটি (বিডিসি) রুবি রানীর পরিবারকে টেকনাফ এরিয়া প্রোগ্রামের আওতায় আল্ট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন (ইউপিজি) কর্মসূচির জন্য বাছাই করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও বিজিএস—এর সহযোগিতায় শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়।
শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে ১৫টি সক্ষমতা উন্নয়ন সেশনে অংশ নেন। সেখানে সঞ্চয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গঠন, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সচেতনতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও যৌতুকবিরোধী নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। উপজেলা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহযোগিতায় আধুনিক সবজি চাষ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ছাগল পালনের প্রশিক্ষণ তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
দুটি ছাগল থেকে আজ স্বপ্নের খামার ২০২৪ সালে টেকনাফ এরিয়া প্রোগ্রাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও বিজিএস—এর সহায়তায় বিকাশের মাধ্যমে তিনি পান ১৮,০০০ টাকা নগদ সহায়তা। এই সামান্য পুঁজি দিয়ে কেনেন দুটি ছাগল, গড়ে তোলেন একটি ছাগলের ঘর। নিয়মিত কঠোর যত্ন, প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান আর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে আজ তাঁর খামারে শোভা পাচ্ছে ১১টি ছাগল। যা প্রতি পাঁচ মাস অন্তর ছাগল বিক্রি করে তিনি আয় করছেন ৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত। এর পাশাপাশি হাঁস মুরগি পালন এবং বাড়ির আঙিনায় নানান জাতের সবজি চাষ করে গড়ে তুলেছেন বাড়তি আয়ের উৎস। এ থেকেও প্রতি মাসে ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা সঞ্চয় করে আজ তাঁর মোট সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে ২০,০০০ টাকার বেশী।
রুবি রানীর এই সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থায় বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের সংজ্ঞাও। এখন সন্তানদের পড়াশোনা, পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিনি। একই সঙ্গে গ্রামের অন্তত ১০টি পরিবারকে আধুনিক ছাগল পালনের কৌশল শেখাচ্ছেন, উদ্বুদ্ধ করছেন আত্মকর্মসংস্থানে।
উচ্ছ্বসিত রুবি রানীর চোখে জল মুছতে মুছতে কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে রুবি রানী বলেন, একসময় সংসারে অভাব ছাড়া কিছুই ছিল না। যখন সন্তানদের মুখে এক চামচ দুধ কিংবা একটা ভালো খাবার তুলে দেওয়ার সামর্থ্য আমার ছিল না। আজ নিজের পরিশ্রম আর টেকনাফ এরিয়া প্রোগ্রাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন এবং বিজিএসের সহযোগিতায় মাথা উঁচু করে তারা আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছে, মর্যাদা দিয়েছে। আজ আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমি পরনির্ভরশীল নই। এখন আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তিন মেয়েকে সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
বর্তমান সাফল্যকে পুঁজি করে তিনি আগামী দিনে নিজের সঞ্চয় ও আয় আরও বাড়িয়ে টেকনাফের বুকে একটি আদর্শ ডেইরি বৃহৎ খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি চান, এই খামার শুধু তাঁর পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না বরং এলাকার বেকার নারীদের জন্যও খুলে দেবে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার। ‘রানী ডেইরি ফার্ম’ হবে এমন এক উদ্যোগ যেখানে পরিশ্রম প্রশিক্ষণ আর আত্মবিশ্বাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয় এটি টেকনাফের প্রান্তিক নারীদের জন্যও এক নতুন আশার নাম।
রুবি রানীর ব্যাপারে সিপিপির জাতীয় শ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত নারী নেত্রী কুলসুমা বেগম বলেন, টেকনাফের রুবি রানী প্রমাণ করেছেন সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের গ্রামীণ নারীরা আর অবলা বা সমাজের বোঝা থাকে না। রুবি টেকনাফের হাজারো ভাগ্যবঞ্চিত ও নিপীড়িত নারীর চোখের ঠুলি খুলে দিয়েছেন। তিনি এক অদম্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এখন তিনি শুধু নিজের পরিবার নয় গ্রামের অন্য নারীদেরও সাহস জোগাচ্ছেন।
রাজাড়ছড়া গ্রামের বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন বলেন, রুবি আমাদের চোখের সামনে বদলে গেছে। আগে যাকে দেখতাম নীরবে কষ্ট সহ্য করতে আজ তাকেই দেখি হাসিমুখে খামার সামলাতে। একসময় যে নারী অবহেলিত ছিল আজ সে গ্রামের ১০টি পরিবারকে আধুনিক ছাগল পালনের বুদ্ধি দিচ্ছে। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজ তার উদ্যোক্তা সফল হয়েছে। আমরা রুবির মতো উদ্যোক্তাদের পাশে থাকতে পেরে গর্বিত ও আমাদের গ্রামের গর্ব। তার এমন উদাহরণ পুরো এলাকার জন্য শিক্ষণীয়।
বাংলা জার্মান সম্প্রীতি (বিজিএস) এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার আব্দুল হামিদ বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয় বরং একটি পরিবারকে স্থায়ীভাবে দারিদ্রের চক্র থেকে বের করে আনা। রুবি রানীর সাফল্য প্রমাণ করে সঠিক প্রশিক্ষণ নিয়মিত পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা পেলে একজন মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই বদলে দিতে পারেন।
সফল উদ্যোক্তা প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম অনীক চৌধুরী বলেন, সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রুবি রানীর মতো সফলতার গল্প অন্যদেরও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে। তার এই উদ্যোগটা এটি কোন সাধারণ পশু পালন নয় বরং একটি প্রযুক্তি নির্ভর ও লাভজনক আধুনিক ক্ষুদ্র খামার। উপজেলা প্রশাসন সবসময় এমন উদ্যোগের পাশে থাকবে।
অন্তহীন অনুপ্রেরণার এক মহাকাব্য রুবি রানীর এই জয়যাত্রা কেবলই এক চরম দারিদ্র্য মুক্তির গল্প নয়। এটি হলো বেঁচে থাকার বাস্তবতা সংগ্রামে মানুষের অদম্য স্পৃহা, শ্রম আর সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার এক কালজয়ী উপাখ্যান। সমাজের প্রতিটি স্তরে রুবির এই মডেল ছড়িয়ে পড়লে টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের কোনো পরিবারই আর দারিদ্রের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে না এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতনমহলের।
সূত্র: যায়যায়দিন
