বাংলাদেশে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে মৎস্য খাতের ভূমিকা আজ অপরিসীম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েও সঠিক প্রযুক্তি আর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার জসিম উদ্দিন। দেশের লাখ লাখ বেকার যুবকের জন্য তিনি আজ এক অনন্য অনুকরণীয় প্রেরণার উৎস।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কল্পবাস গ্রামের এই সফল মৎস্য চাষির নাম মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। আজ থেকে ২২ বছর আগে, ২০০৪ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে পারিবারিক অনুপ্রেরণায় তিনি মৎস্য চাষ শুরু করেছিলেন। তরুণ বয়সের সেই ছোট্ট প্রয়াস আজ রূপ নিয়েছে এলাকার অন্যতম বৃহৎ এক মৎস্য খামারে। একসময় তাঁর তত্ত্বাবধানে মোট ৬৪টি পুকুর থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ের বন্যায় খামারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দুর্যোগে দমে না গিয়ে বর্তমানে তিনি ৩০টি পুকুরে নতুন উদ্যমে মাছ চাষ পরিচালনা করছেন।

উৎপাদনের দিক থেকেও জসিম উদ্দিনের সাফল্য বেশ ঈর্ষণীয়। তিনি তাঁর পুকুর গুলোতে কার্ব জাতীয় মিশ্র মাছ চাষ করছেন। বছরে সাধারণত একবার তিনি খামারের মাছ বিক্রি করেন। প্রতিটি মাছের ওজন গড়ে ১ থেকে ২ কেজি হলে তা বাজারে তোলা হয়। বর্তমানে তাঁর ৩০টি পুকুর থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩৬০ টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, যা স্থানীয় ও জাতীয় প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে বড় অবদান রাখছে।
মৎস্য খামারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রোগবালাই। খামারে ভাইরাস বা উকুনের আক্রমণ হলেও জসিম উদ্দিনকে চিকিৎসার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না। কারণ, তাঁর নিজের অ্যানিম্যাল ও ফিশ মেডিসিনের দোকান রয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, পুকুরে নিয়মিত চুন, লবণ ও পটাশ ব্যবহার করলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এ ছাড়া মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য তিনি নিয়মিত মানসম্মত তৈরি খাবার (রেডি ফিড) ব্যবহার করেন।

জসিম উদ্দিনের এই উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। বর্তমানে ৪ জন শ্রমিক তাঁর খামারে স্থায়ী ভিত্তিতে মাসিক বেতনে কাজ করছেন। এ ছাড়া মাছ ধরা ও নতুন করে পুকুর প্রস্তুত করার সময়ে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক দিনমজুর শ্রমিক কাজ পেয়ে থাকেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে।
মাছ চাষে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জসিম উদ্দিন একাধিকবার সরকারি সম্মাননা পেয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে উপজেলা মৎস্য দপ্তর ব্রাহ্মণ পাড়া থেকে তিনি পুনরায় শ্রেষ্ঠ সফল মৎস্য চাষি হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
নতুন ও বেকার উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে জসিম উদ্দিনের পরামর্শ হলো – সঠিক জ্ঞান নিয়ে মাছ চাষে নামলে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, মাছ চাষে সফল হতে হলে ভালো মানের পোনা নির্বাচন এবং পুকুর প্রস্তুতির কৌশল জানা সবচেয়ে জরুরি। তাঁর খামারে কেউ পরামর্শের জন্য এলে তিনি সানন্দে সহযোগিতা করেন এবং প্রয়োজনে তাদেরকে সরকারি মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।
পরিদর্শনের শেষ পর্যায়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে জসিম উদ্দিনের হাতে মৎস্য চাষ বিষয়ক বিভিন্ন আধুনিক দিকনির্দেশনামূলক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়, যা তাঁর আধুনিক চাষাবাদকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
প্রতিবেদক, খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা
