চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ব্যাপারী সবুজ মিয়া রাজধানীর গাবতলী হাটে তুলেছেন ১০টি দেশি গরু। আকারে বড় গরুগুলো আনতে খরচ হয়েছে ১ লাখ টাকা। তার ভাষ্য, সব ধরনের পশুর খাদ্যের দাম চড়া, বেড়েছে গাড়ি ভাড়া। প্রতিটি গরু ৫ লাখ টাকা বিক্রি করতে চান তিনি। তবে এই দামে বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। কারণ ক্রেতার কাছে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। যারা আসছেন, বড় গরুর দাম শুনেই চলে যাচ্ছেন।
একই হাটে ২৫টি গরু নিয়ে এসেছেন ফরিদপুরের আলামিন মিয়া। তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের দেখে মনে হচ্ছে চরম টানাটানিতে আছেন। বাজারের সবচেয়ে ছোট ও কম দামি গরু খুঁজছেন অনেকে।’ ঢাকায় এনে গরু বিক্রি করে যে দাম পেয়েছেন, তাতে খুশি নন লালমনিরহাটের সিদ্দিক ব্যাপারী। দেশি জাতের এক জোড়া গরু বিক্রি করেছেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। তার দাবি, ‘গরু দুটি থেকে ৮ মণ মাংস মিলবে। গাবতলী হাটে এনে আশানুরূপ দাম পাওয়া গেল না। অযথা গাড়ি ভাড়া দেওয়া লাগল।’
রাজধানীতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পশুহাট বসার কথা থাকলেও আগেভাগেই বেচাকেনা শুরু হয়েছে। এবার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে রাজধানীতে ২০টি পশুর হাট বসছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৯টি হাট বসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাটগুলোতে গরু-ছাগল নিয়ে এসেছেন খামারিসহ বিক্রেতারা।
কয়েকদিন আগেই হাটগুলোতে পশু আনা হয়েছে। তবে বেচাকেনা তেমন হয়নি। আজ থেকে পুরোদমে বিক্রি শুরু হবে।
বিক্রেতারা জানান, হাটে অনেক ক্রেতা আসছেন, তারা ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন। পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় গরু-ছাগলের দাম বেশি। হাটে আসা ক্রেতাদের দাবি, আকাশচুম্বী দাম চাচ্ছেন ব্যাপারীরা। এর ফলে দরকষাকষি বেশি হচ্ছে। এবার হাটে ৮০ হাজার টাকার কমে কোনো গরু মিলছে না। এ ছাড়া গরু কিনে রাখার জায়গা নেই। তাই অনেকে বাজার ঘুরে ঈদের দু-এক দিন আগে গরু কিনবেন। এদিকে পশুর হাটে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা রেখেছে সিটি করপোরেশন। প্রতিটি হাটে ব্যাংকের বুথ, জাল নোট শনাক্তের মেশিন, পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার ও নিরাপত্তা চৌকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাড়িতে পালন করা ৫টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন ব্যাপারী শফিকুর রহমান। গরুগুলোর বয়স চার থেকে পাঁচ বছর। ‘কুষ্টিয়ার ডন’ নামে ১৮ মণ মাংস মিলবে এমন গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ১২ লাখ টাকা। শুধু শফিকুর নন, একই এলাকার আরও পাঁচজন মিলে কয়েকটি ট্রাক ভাড়া করে দেশি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন বাড়তি দামের আশায়। ব্যাপারীরা বলেন, গরুর খাবারের দাম বেশি, শ্রমিক রাখলে তাদের বেতনও বেশি। গরুপ্রতি দিনে খরচ হাজার ১২০০ টাকা। তাহলে মাসে খরচ কত আপনারাই বলেন! এ ছাড়া বিদ্যুৎ, সাবান, শ্যাম্পু, মশার কয়েলের খরচ আছে।
গরু কিনতে আসা আনিসুর রহমান বলেন, ‘গরুর দাম এবার অনেক বেশি। ব্যাপারীরা গরুর বাড়তি দাম চাইছেন। গত বছর যে গরু ১ লাখ টাকায় কিনেছি এবার তার দাম ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বাড়তি। তার পরও এই দামে ব্যাপারীরা গরু ছাড়তে চাইছেন না। তবে ঈদের এক দিন আগে গরু ঠিকই ছাড়বেন, দরকার হয় ঈদের আগের রাতে গরু কিনব।’
হাটের প্রবেশদ্বারের কাছেই বিক্রি হচ্ছে দেশি নানান জাতের ছাগল। এদিন ৮ হাজার টাকায় একটি ছাগল কিনেছেন জমির মিয়া। তিনি জানান, লাখ টাকার গরু কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দিতে হবে, এজন্যই ছাগলটা কেনা।
ব্যাপারীরা জানিয়েছেন, সাধারণত দুটি কারণে ছাগলের কদর বেশি হাটে। প্রথমত অনেকের এককভাবে গরু কেনার সামর্থ্য নেই, সে কারণে ভাগে গরু না কিনে এককভাবে ছাগল কোরবানি দেন। সব শ্রেণির ক্রেতার জন্য গাবতলী হাটে ৮ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকায় ছাগল মিলছে। ব্যাপারীদের দাবি, তারা হাটে কোনো বিদেশি ছাগল তোলেননি, সবই দেশি।
হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছাগলের সরবরাহ বেড়েছে। সব ছাগলই দেশি। মানিকগঞ্জ, পদ্মার চরবর্তী এলাকা, পাবনা, রাজশাহী, খুলনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ জেলা থেকে হাটে বেশি ছাগল এসেছে। চট্টগ্রামে ফটিকছড়ির ছাগলও হাটে বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানের হাটে থেকে ছাগল সংগ্রহ করেও ব্যাপারীরা গাবতলী হাটে বিক্রি করছেন।
রাজধানীতে কোরবানির পশু সাধারণত ঈদের এক-দুদিন আগে বেশি বিক্রি হয়। এখন যেসব গরু বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ ক্রেতাই ঢাকার আশপাশের এলাকার, বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, সাভারের। যাদের বাড়িতে খোলামেলা খালি জায়গা পড়ে আছে, তারাই মূলত গরু কিনছেন এখন। গরু কিনে পিকআপে বাসায় ফিরছিলেন কেরানীগঞ্জের জলিল হাজি। তিনি বলেন, ‘১ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় গরু কিনলাম, বাকিটা আল্লাহ ভরসা।’
মেরাদিয়া হাটে কুদ্দুস নামের একজন ব্যাপারী জানান, তিনি ঝিনাইদহ থেকে এসেছেন। ১৮টি গরু নিয়ে এসেছেন। বিভিন্ন সাইজের গরু। সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২ লাখ টাকার গরু রয়েছে তার কাছে। এক লাখ টাকার নিচে তার কাছে গরু নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু আমার কাছে নয়, পুরো হাটেই ১ লাখ টাকার নিচে গরু পাবেন না।’
ধোলাইখাল ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন পশুর হাটের মাইক থেকে পশু বিক্রির পরে কেউ যেন রশিদ ছাড়া না যান সেটি সতর্ক করা হচ্ছে। হাটের চৌহদ্দি ট্রাকস্ট্যান্ডের আশপাশের এলাকায় করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি আর থাকেনি। রায়সাহেব বাজার থেকে দয়াগঞ্জ মীরহাজারী বাগ, মুরগীটোলা থেকে লোহারপুল, ধুপখোলা মাঠের আশপাশের গলি আর ওয়ারীর টিপু সুলতান রোড পর্যন্ত সড়কের মধ্যে চার কিলোমিটার জুড়ে পশুর হাট বসেছে। হাটের চার পাশের সড়ক দিয়েই ট্রাকে ট্রাকে আসছে গরু। তবে এখনো এই পশুর হাট জমে ওঠেনি। খামারি আর ইজারাদাররা বলছেন, ঢাকার বাইরে থেকে পশু আসা আর হাটের সব প্রস্তুতি শেষ। বৃহস্পতিবার সরকারি অফিস ছুটির পরে রাত থেকেই ক্রেতারা হাটে আসা শুরু করবেন, শুরু হবে বেচাবিক্রিও।
ধুপখোলা ট্রাকস্ট্যান্ডের পাশেই পোস্তগোলা শ্মশানঘাট পশুর হাট। এই হাটটিও বুড়িগঙ্গার বেড়িবাঁধের চৌহদ্দি পার হয়ে আশপাশের গলিতে ঢুকে গেছে। সড়কের দুইপাশে সারি করে গরু রাখায় সড়ক বন্ধ হলেও এখনো ট্রলারে ট্রলারে আসছে গরু। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে শ্যামপুর হাটেরও একই অবস্থা। মহাসড়কের মধ্যে এর মধ্যেই হাট বসে গেছে। দনিয়া কলেজ সংলগ্ন হাটটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুপাশের চার সারি করে আশপাশের গলির মধ্যেও ঢুকে গেছে।
দনিয়া পশুর হাটে কুষ্টিয়া থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আজহার মাহমুদ বলেন, এবার খরচা বেশি। আপাতত ৪টি গরু এনেছি। দাম সাড়ে ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। একেকটা গরু রাখা বাবদ দিতে হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। এর বাইরে গরু আনা, গরু ও নিজের খাবার খরচ, রাখাল খরচ, সব মিলে লাখ টাকা বিক্রির আগেই চলে গেছে।
কবে থেকে জমতে পারে গরুর এই স্থায়ী হাট—জানতে চাইলে ছাগল ব্যবসায়ী মো. হাছান বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে জমবে হাট। বৃহস্পতিবার মানুষ অফিস শেষ করেই হাটে আসবেন। শুক্র-শনিবার তো অফিস আদালত বন্ধ। আর রোববার থেকে তো সরকারি ছুটি। এবার মনে হচ্ছে হাট জমবে। দেরিতে হলেও হাট জমুক, সে আশায় আছি।
হাটে গরুর দাম চড়া হলেও কোরবানির ঈদ উপলক্ষে দেশে গরু-ছাগলের ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে পশুর কোনো ঘাটতি না থাকায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এবার কোরবানির ঈদ ভালোভাবে করতে পারবেন। গত বছর প্রায় পাঁচ লাখ গবাদি পশু অবিক্রীত ছিল। এ বছর তার সঙ্গে আরও সাড়ে চার লাখ পশু যোগ হয়েছে। আমাদের দেশে চাহিদা ১ কোটি ২৯ লাখ পশু, সেখানে আছে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি।’