কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলার লোলাই গ্রামের গৃহিণী ফরিদা আক্তার। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারী ২০০৪ সালে এসএসসি পাশ করার পর শিক্ষাজীবন শেষ করে গৃহস্থালি জীবনে প্রবেশ করেন। সংসার, সন্তান, এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়েই দিন চলছিল তার। কিন্তু ভাগ্য বা সময় তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তার স্বপ্ন দেখার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসই তাকে আজ সফল একজন নারী উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত করেছে।
বিয়ের পর ফরিদা আক্তারের স্বামী যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। দেশ ও সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে ফরিদার কাঁধে। তবুও দমে যাননি তিনি। নিজের অবস্থান শক্ত করতে, নিজের এবং ছেলের ভবিষ্যৎ গড়তে তিনি উদ্যোগী হয়ে ওঠেন কিছু করার জন্য। প্রথমে স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে একটি লেয়ার মুরগির খামার শুরু করেন। কিছুদিন খামার চালালেও লাভের মুখ দেখেননি। মুরগির রোগবালাই, বাজারে ডিমের দাম ওঠানামা এবং ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার অভাব মিলিয়ে এক পর্যায়ে এই খাত থেকে সরে আসেন।
তবে এখানেই থেমে যাননি ফরিদা। বরং ব্যর্থতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে পথ খুঁজে নিতে শুরু করেন। এবং তার সেই খোঁজ এসে থামে গরুর খামারের দিকে। প্রথমে ফরিদা আক্তার ১-২টি গরু কিনে পালন শুরু করেন। ধীরে ধীরে গরু পালনের অভিজ্ঞতা বাড়ে। গরুর খাওয়ানো, চিকিৎসা, পরিচর্যা সবকিছু নিজ হাতে শিখে নিতে থাকেন। গরুর দুধ বিক্রি করে সামান্য আয় শুরু হয়। এই ছোট সাফল্যই তাকে উৎসাহ দেয় আরও বড় পরিসরে খামার গড়তে। অবশেষে ২০১৮ সালে তিনি পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে গরুর খামার শুরু করেন
বর্তমানে তার খামারে ৮০টির মতো গরু রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই হলেস্ট্রাইন ফ্রিজিয়ান জাতের, আর কিছু রয়েছে শাহীওয়াল জাতের। হলেস্ট্রাইন ফ্রিজিয়ান জাতের গরু দুধ উৎপাদনে বেশি সক্ষম এবং শাহীওয়াল জাতের গরু রোগ প্রতিরোধে ও গরুর মানে ভালো হওয়ায় বাজারে দামে ভালো পাওয়া যায়। ফরিদার খামারে বর্তমানে ১৫টি গাভী দুধ দিচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ২২০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এই দুধ স্থানীয় মিষ্টির দোকানে এবং আশেপাশের বেপারিদের কাছে বিক্রি করা হয়। কখনো কখনো খুচরা ক্রেতাদের কাছেও সরবরাহ করা হয়। দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে তিনি একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে দুধ দোহন করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজিং ব্যবস্থাও খামারে রাখা হয়েছে। দুধের গুণমান ভালো রাখার জন্য খামারে সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা হয়। দুধ সংগ্রহের সময় হাইজিনিক বালতি ও ফিল্টার ব্যবহার করা হয় যাতে গ্রাহকের কাছে বিশুদ্ধ দুধ পৌঁছে দেওয়া যায়
খামারে বর্তমানে ৫ জন প্রশিক্ষিত শ্রমিক কাজ করছেন। তারা গরুর গোসল করানো, খাওয়ানো, গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, দুধ দোহন, গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণসহ সব ধরণের কাজ করেন। ফরিদা নিজেই সবকিছু তদারকি করেন, প্রতিদিন গরুর খোরাকের পরিমাণ, স্বাস্থ্য, আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। ফরিদা একজন দায়িত্বশীল মালিক হিসেবে খামারের প্রতিটি দিক বিবেচনা করেন। তিনি শ্রমিকদের সময়মতো বেতন প্রদান করেন এবং খুশি রাখতে চেষ্টা করেন, যাতে কাজের প্রতি তাদের আন্তরিকতা বজায় থাকে। গরুর খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ফরিদা আক্তার অত্যন্ত সচেতন। প্রতিটি গরুকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুষম খাবার দেওয়া হয়। খাদ্য তালিকায় থাকে খৈল, ভূষি, ভুট্টা, খড়, সবুজ ঘাস এবং মাঝে মাঝে খনিজ লবণ ও ভিটামিন। তিনি নিজেই খামারের জন্য সবুজ ঘাসের জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছেন যাতে খরচ কমে এবং গরুর জন্য প্রাকৃতিক খাবার নিশ্চিত হয়। গ্রীষ্মকালে গরুর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য খামারে ফ্যান, পানি ছিটানোর ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতি মাসে একজন প্রাণি চিকিৎসক দ্বারা গরুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। গরুকে নিয়মিত টিকা প্রদান করেন । গরু অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি গরুর শরীরের আচরণ বুঝে যান কখন গরু সুস্থ, আর কখন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে গরুর মৃত্যু বা বড় ধরণের লোকসান থেকে বাঁচিয়েছে বহুবার।
ফরিদা আক্তার বিভিন্ন সময় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার গরু পালনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের স্থানীয় কার্যালয় থেকে পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং মাঝে মাঝে খামার প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এতে করে গরুর রোগ-বালাই, আধুনিক খোরাক ব্যবস্থাপনা, প্রজনন পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে ভালো জ্ঞান লাভ করেন। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অসুস্থ গরু, বাজারে দুধের দাম কমে যাওয়া, শ্রমিকের অনুপস্থিতি – সব ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু ফরিদা কখনো হার মানেননি। তিনি ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেছেন। তার এই মানসিক শক্তিই তাকে সফল করেছে। একজন গৃহিণী থেকে সফল খামারি হিসেবে ফরিদা আক্তার আজ এলাকার নারী সমাজের কাছে রোল মডেল। তার খামারে এখন আশেপাশের অনেক নারী কাজ শিখতে আসেন। কেউ কেউ নিজের খামার গড়ার স্বপ্ন দেখেন তাকে দেখে। ফরিদার স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। তিনি গরুর দুধ থেকে দই, ঘি, ছানা তৈরির উদ্যোগ নিতে চান। এছাড়াও আরও বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন তিনি।
ফরিদা আক্তারের গরুর খামার কেবল একটি আয়ের উৎস নয়; এটি একটি নারীর সাহস, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং আত্মনির্ভরতার প্রতিচ্ছবি। তার এই সাফল্য তাকে নয়, পুরো সমাজকে বদলে দেওয়ার শক্তি রাখে।
সবশেষে,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয় এসাথে দপ্তরের বিভিন্ন কাজ ও পরিচিতি দেয়া হয়।
