৭২
পানি থেকে কীভাবে মাছের শরীরে হেভি মেটাল প্রবেশ করে-
খাদ্য থেকে কিভাবে মাছের শরীরে হেভি মেটাল প্রবেশ করে-
কোন ধরনের প্রাণীতে হেভি মেটাল বেশি জমে-
ক্ষারীয় পানিতে মাছচাষ করতে হবে
মাটির ক্ষারীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে মাছ ও শস্যের আবাদ করতে হবে।
Remediation Technology:
Clays/Layered Double Hydroxides (LDHs)
Biomass and Bio sorption of Metals Ions.
Magnetic Nanoparticles as Nanosorbents. এর ব্যবহার।
Activated carbons এর ব্যবহার।
Reverse osmosis
Electrochemical Treatment
Filtration-Nanofiltration/Ultrafiltration.
Photocatalysis.
কুচুরিপানা- মোট জলাশয়ের আংশিক অথবা সম্পূর্ণ এলাকায় কুচুরিপানা রেখে দিয়ে দুষিত পানি থেকে হেভি মেটাল দূর করা যায়।
ক্যালশিয়াম-ম্যাগনেশিয়াম হার্ডনেসঃ হার্ডনেস বৃদ্ধি করলে মাছে হেভি মেটাল প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়।
EDTA: Ethylene Diamaine tetra acetic acid (EDTA) পানি থেকে হেভি মেটাল শোষণ করে।
Aeration: এয়ারেশন দেয়ার ফলে হেভি মেটাল অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে অদ্রবণীয়রুপ ধারণ করে।
Bio adsorbent:
cryogels: ক্রায়োজেল অর্থাৎ প্রাকৃতিক বায়োপলিমার ব্যবহার করে হেভি মেটাল দূর করা যায়।
পৃথিবীতে এ পর্যন্ত মোট ১১৮টি মৌল চিহ্নিত হয়েছে যার মধ্যে ৯৮টি প্রকৃতিতে পাওয়া যায়, বাকী ২০টি কৃত্রিম উপায়ে তৈরী করা হয়।
তন্মধ্যে যে সমস্ত মৌলের আনবিক সংখ্যা ২৫ বা তার বেশি তাদেরকে হেভি মেটাল বলে।
সেই অর্থে লেড (সিসা), মার্কারি, ক্যাডমিয়াম, , আর্সেনিক, নিকেল, ক্রোমিয়াম,টিন, জিংক, কপার, অ্যালুমিনিয়াম, আয়রন, কোবাল্ট, সেলেনিয়াম, বেরিয়াম, স্টেনাম, ম্যাংগানিজ ইত্যাদি মৌলগুলো হেভি মেটাল।
হেভি মেটাল মৌলগুলোকে ধবংস করা যায় না। এদের স্ফুটনাংক বেশি সুতরাং রান্না করার তাপমাত্রায় ধ্বংস করা যায় না। এদের কোনকোনটি ক্ষতিকর আবার কোনোকোনোটি উপকারী।
যেকোনো ভাবেই ক্ষতিকর হেভি মেটাল মানুষের দেহে গেলে জটিল রোগ হয়। তাই বলে আতঙ্ক সৃষ্টি নয় বরং দেখতে চাই মাছের পেটে হেভি মেটাল কীভাবে যায়?
মাছের বাড়ি পানি। মাছ তার বাড়িতে বড় হয়। এই বাড়ি থেকেই মাছ তাদের খাদ্য গ্রহণ করে।
সুতরাং মাছের শরীরে হেভি মেটাল প্রবেশের মোটাদাগে উৎস (Point source) দুটি, একটি পানি অপরটি খাদ্য।

অম্লীয় অর্থাৎ পিএইচ ও অক্সিজেন কম থাকে এমন পানিতে ক্ষতিকর হেভি মেটাল দ্রবীভূত (Soluble) বা আয়ন (ion) অবস্থায় থাকে। আর কেবল এই দ্রবীভূত অর্থাৎ আয়ন অবস্থায় হেভি মেটাল পানি থেকে মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
পক্ষান্তরে ক্ষারীয় অর্থাৎ পিএইচ ও অক্সিজেন বেশি থাকে এমন পানিতে হেভি মেটাল অদ্রবণীয় (Insoluble) অর্থাৎ নন-আয়োনিক (Non-ionic) অবস্থায় থাকে। আর হেভি মেটাল নন-আয়োনিক অবস্থায় পানি থেকে মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে না।
মানুষ কর্তৃক পানির গুণাগুণ পরিবর্তন করা না হলে প্রাকৃতিকভাবেই স্বাদু বা মিষ্টি পানির পিএইচ সাধারণত ৬.৫-৯.০ এই মাত্রায় থাকে। সমূদ্রের পানির পিএইচ ৭.৫-৮.৫ মাত্রায় থাকে। আমার অভিজ্ঞতায় আমি নিশ্চিত, ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের খাল, বিল, নদী-নালার পানির পিএইচ প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষারীয় মাত্রায় থাকে।
তাছাড়া আমরা মাছচাষিগণ চাষের জলাশয়ে পানির পিএইচ ক্ষারীয় মাত্রায় রাখি।
সুতরাং ক্ষারীয় পানির জলাশয় থেকে মাছের শরীরে হেভি মেটাল প্রবেশের সুযোগ নেই।
ব্যতিক্রম শুধু যেসকল জলাশয়ে পয়ঃনিষ্কাশন স্লাজ অথবা বর্জ্য পানি প্রবেশ করে, রঙ শিল্প, ডাইং শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যের প্রবাহিত(Effluent) পানি প্রবেশ করে এবং সেই জলাশয়ে পানির পিএইচ অম্লীয় মাত্রায় থাকলেই কেবল সেই জলাশয়ে হেভি মেটাল দ্রবীভূত অবস্থায় থাকতে পারে।
সুতরাং ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই। ব্যাতিক্রম দিয়ে মাছের শরীরে সিসা বা হেভি মেটালের কলঙ্ক দেয়া ঠিক নয়।

মাছের খাদ্য প্রধানত উদ্ভিদজাত (Plant by-products)। প্রাণীজ প্রোটিন উৎস হিসেবে ফিসমিলও খাদ্যে প্রয়োগ করা হয়। মাছে হেভি মেটালের উপস্থিতি নিয়ে ইতিপূর্বে বলেছি। সুতরাং ফিস মিলে হেভি মেটাল পাওয়ার সুযোগ নেই।
উদ্ভিদ ভূপৃষ্ঠে জন্মে। গঠনগতভাবেই ভূপৃষ্ঠের মাটি ক্ষারীয়। কারণ ভূপৃষ্ঠে ক্ষারীয় মিনারেল যেমন- ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম এ মৌলগুলোর আধিপত্য থাকায় ভূপৃষ্ঠের মাটি ক্ষারীয়।
আগেই বলেছি ক্ষারীয় পানিতে ক্ষতিকর
হেভি মেটাল অদ্রবণীয়। আর যেহেতু ক্ষারীয় পরিবেশের মাটি থেকে উদ্ভিদ মূলরোমের সাহায্যে পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করে বিধায় উদ্ভিদে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হেভি মেটাল জমতে পারেনা।
ফলে মাছের উদ্ভিদজাত খাদ্য যেমন খৈল, কুড়া, গমের ভূষি ইত্যাদি উপাদানেও হেভি মেটাল থাকবে না।
তাছাড়া খাদ্য আইনের আওতায় মৎস্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে নিবিড় তদারকি ও পরিক্ষা-নিরিক্ষার মাধ্যমে ফিডমিলগুলো খাদ্য তৈরি ও সরবরাহ করছে।
তাই প্রচলিত ও স্বাভাবিক চাষ পদ্ধতিতে মাছের পেটে সিসা বা হেভি মেটাল প্রবেশ করার সুযোগ নেই।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের গবেষণামতে ট্রফিক লেভেল ( trophic level) বিবেচনায় টারশিয়ারি (tertiary) পর্যায়ের জীব বা প্রাণীদের শরীরে বেশি পরিমাণ হেভি মেটাল জমে।
বোয়াল, শোল, গজার টারশিয়ারি পর্যায়ের মাছ। তারপরেও এসব মাছের শরীরে হেভি মেটাল জমবে না কারণ ক্ষারীয় পানি থেকে হেভি মেটাল কোন প্রজাতির মাছেই জমে না।
চাল, ডাল, ফলমূল, শাকসব্জির কোনটিই টারশিয়ারি লেভেলের জীব নয়।
ফলে ভোক্তা হিসেবে মানুষ টারশিয়ারি লেভেলের প্রাণী হয়েও বাংলাভিশনের সংবাদ মতে জেব্রা মারা যাওয়ার ন্যায় মানুষ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায় না ।
আমি গবেষণার পক্ষে। গবেষণা হয়েছে বিধায় এত কথা লিখতে পাড়ছি। তাই বিজ্ঞানীগণ পূজনীয়।
খাদ্য উৎপাদন ও অবকাঠামো নির্মাণে বৈজ্ঞানিক কলা-কৌশল আবিষ্কার করে আশাজাগানিয়া সাফল্য দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
এখন প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্য। প্রয়োজন নিরাপদ গবেষণা, গবেষণার নিরাপদ প্রকাশ, নিরাপদ ও সবুজ বা পজেটিভ প্রচারণা।
হেভি মেটালের উৎস (Point source) জানা, তাছাড়া ভূত্বকেও হেভি মেটাল আছে। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই প্রকৃতিতে বিদ্যমান। তাই শুধুমাত্র সরকার, খাদ্য কর্মকর্তা ও কৃষক বা চাষিদেরকে সতর্ক করার জন্যই খাদ্যে হেভি মেটালের উপস্থিতি নির্ণয় করা গবেষণার বিষয় হওয়া সমীচীন কি না তা আমাদের সকলের ভাবা উচিত । শিল্প বিপ্লবের যুগে Point source পুরোপুরি বন্ধ করাও সম্ভব নয়। তাই বরং
খাদ্য শিকল থেকে কীভাবে হেভি মেটালকে দূরে রাখা যায়? খাদ্য শিকলে হেভি মেটাল ঢুকে পড়লে তা কত সহজে ও কত দ্রুত খাদ্য শিকল থেকে আলাদা করা যায়, এমন বৈজ্ঞানিক কৌশল আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে গবেষণা প্রয়োজন।
স্যার আইজাক নিউটন আপেল গাছের নিচে বসে “মাধ্যাকর্ষণ ” শক্তি আবিষ্কার করেছিলেন। এই একটি আবিষ্কার, পৃথিবীকে আজকের এই বিজ্ঞান নির্ভর আধুনিক মানব কল্যাণের পৃথিবীতে রুপান্তর করতে ভূমিকা রেখেছে।
আর্কিমিডিস এর সময় রাজা হিয়েরোর জন্য একটি সোনার মুকুট প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর্কিমিডিসকে দায়িত্ব দেওয়া হয় যে, মুকুটটি না ভেঙ্গে এই মুকুটটি আসলেই শুধু স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত, না কি এর মধ্যে ভেজাল রয়েছে?
চিন্তা করতে করতে তিনি গোসল করতে গেলেন।যখন তিনি বাথটাবে গোসল করতে নামলেন তখন তিনি দেখলেন যে বাথটাবের পানির উচ্চতা বেড়ে গেছে।
তিনি “ইউরেকা ইউরেকা”(অর্থ: আমি পেয়েছি) বলে চিৎকার করতে করতে রাস্তায় নেমে পড়লেন। উল্লেখ্য যে, তিনি এতই আনন্দিত হয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর জামা-কাপড় পরতে ভুলে গিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে আর্কিমিডিস একটি তত্ত্ব দেন। তাঁর তত্ত্বটি হচ্ছে: “ কোন বস্তুর ওজন এটি দ্বারা অপসারিত তরলের ওজনের সমান”। আর্কিমিডিস(Archimedes) এর এই তত্ত্বটির উপরই জাহাজ বা অন্যান্য জলযান পানিতে ভেসে থাকে।
দেখুন গবেষণাগার ছাড়াই শুধুমাত্র ভাবনা দিয়ে ভেবে বরেণ্য বিজ্ঞানী নিউটন ও আর্কিমিডিস কত বড় তত্ত্ব ও তথ্য আবিষ্কার করেছেন!
পরিবর্তন ছাড়া স্থায়ী কিছু নেই তাই গবেষণা ও আবিষ্কারে পরিবর্তন অনিবার্য। বিজ্ঞান একজনের ভাবনায় চলে না। অতীত-বর্তমানের বিজ্ঞানীদের নানান কাজের সঙ্গে নিজের ভাবনা মিশিয়ে নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করানোই বিজ্ঞানীদের কাজ। নিউটন ও আর্কিমিডিসের মত গুণী বিজ্ঞানিদের দেয়া তত্ত্ব ও তথ্য দিয়েই অতীত-বর্তমান বিজ্ঞানীরা এই আধুনিক পৃথিবীর রুপকার।
মানুষ এমন জনকল্যাণমুখী হিতকর অনুসন্ধিৎসু গবেষণাই কামনা করে। সৃজনশীল কাজই (Creative) দেশ জাতি সংস্কৃতিকে সম্মৃদ্ধ করে। সভ্যতার বিকাশ ঘটায়।
আমি মাছের মানুষ। তাই আজ মাছকে হেভি মেটালমুক্ত রাখতে এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত কিছু পরামর্শ অথবা কৌশল তুলে ধরছি –


দুষিত জলাশয় হেভি মেটাল মুক্ত করে বিশুদ্ধ করে সেই জলাশয়ে মাছচাষ করতে নিম্নের পদ্ধতিগুলোর ব্যবহার অথবা পদ্ধতিসমূহ আরও উন্নত ও সহজতর করার জন্য গবেষণা আবশ্যক।

-Precipitation and coagulation/Flocculation.
-Ion exchange- জিওলাইট প্রয়োগ।
-Membrane filtration
-Bioremediation
-Heterogeneous Photocatalysts
-Adsorption













ব্যাকটেরিয়া যেমন- Bacillus subtilis, Bacillus megaterium – ক্যাডমিয়াম এবং
Aspergillus niger, Penicillium sp. – ক্রোমিয়াম শোষণ করে।

সর্বোপরি সম্পদ (জনবলসহ) থাকলেই একটা জাতি উন্নত হয় না, সঙ্গে দরকার জ্ঞানচর্চার সংযোজন। একটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রজন্মের সঙ্গে প্রয়োজন একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার সংগ্রামের মাধ্যমে একটি আলোকোজ্জ্বল দেশ গড়া সম্ভব । সম্পদই শেষ কথা নয়, জ্ঞানচর্চাই বড় কথা।
আসুন, জ্ঞানের চর্চা করি, গবেষণা করি, দেশ গড়ি।
লেখক ঃ মো.আব্দুস ছালাম পি কে , সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার, মৎস্য ভবন।