১৩.০৭.২০২৫ খ্রি.কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রামের আলেক হোসেন একজন সমাজসেবক ও ধর্মপরায়ণ মানুষ। এলাকার মসজিদ ও মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেও তিনি শুধু ধর্মীয় কাজের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আজ থেকে দশ বছর আগে, যখন তিনি তার বাড়ির পাশে থাকা ১২০ শতাংশের পুকুরটিকে মাছ চাষের জন্য ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেটি কেবল তার পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যেই ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন, এখান থেকে প্রাপ্ত আয় যদি মাদ্রাসার এতিম শিশুদের কল্যাণে ব্যয় করা যায়, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত সমাজসেবা।
প্রথম দিকে তিনি কার্পজাতীয় মাছ চাষ শুরু করেন। কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু ধৈর্য ছিল। মাদ্রাসার ছাত্ররাই তার সাথে এক হয়ে খামারের কাজগুলো সামলাতে শুরু করে। কেউ খাবার দিত, কেউ পানি পরিষ্কার করত, আবার কেউ মাছের বৃদ্ধির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করত। এতে একদিকে ছাত্রদের হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ হলো, অন্যদিকে খামারের খরচও কমে গেল। এক বছর আগে আলেক হোসেন তার ছেলে নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে সামুদ্রিক কোরাল মাছ নিয়ে এসে পুকুরে চাষ
শুরু করলেন। স্থানীয়দের অনেকেই তখন সন্দিহান ছিল, পুকুরে সামুদ্রিক মাছ চাষ করা যাবে তো? কিন্তু আলেক হোসেন চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। কোরাল মাছ বড় হতে শুরু করেছে এখন তার খামারের বৈচিত্র্য বেড়েছে, বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই খামারের মাছের খাবারের জন্য আলেক হোসেন ব্যয়বহুল কিছু ব্যবহার করেন না। চালের কুঁড়া, সবজির ফেলে দেওয়া অংশ দিয়েই তিনি মাছের খাবার তৈরি করেন। এতে তার উৎপাদন খরচ কম থাকে। তাছাড়া, ভাগ্যের সহায়তাও কম ছিল না- গত দশ বছরে তার পুকুরে কখনো মাছের রোগ দেখা দেয়নি। তবে প্রচুর পরিমানে ক্ষুদিপানা লক্ষ্য যাচ্ছে। প্রতি বছর এই পুকুর থেকে প্রচুর পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হয়। কিছু মাছ পরিবারের খাবারের জন্য রেখে বাকি মাছ বাজারে বিক্রি করা হয়। বিক্রয় থেকে যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশ তিনি মসজিদ ও মাদ্রাসার কাজে ব্যয় করেন। এতিম শিশুদের খাবার, পোশাক ও পড়াশোনার খরচের একটা বড় অংশ এই খামারের আয় থেকেই আসে। যেহেতু শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো খরচ নেই, তাই তার আয়-ব্যয়ের হিসাব খুব সহজসরল। সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য
দপ্তর, আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা থেকে আলেক হোসেনকে আধুনিক ও বাণিজ্যিক মাছ চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি এখন ভাবছেন, যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খামারটিকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে মাদ্রাসার শিশুদের জন্য আরো বেশি সহায়তা করা সম্ভব হবে। আলেক হোসেনের এই পারিবারিক মৎস্য খামার এখন আর কেবল তার পরিবারের জন্য আয়ের উৎস নয়, এটি এলাকার মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা। এটি শুধু মাছ চাষের গল্প নয়, বরং একজন মানুষের স্বপ্ন, শ্রম ও সমাজসেবার সফলতার প্রতিচিত্র।
প্রতিবেদনকারী:
খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
