গ্রামের ছেলে ওমর ফারুক, কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার কাজি পাড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। এক সময়ের সাধারণ ছাত্র, যিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, আজ তিনি একজন সফল গরুর খামারি ও নতুন উদ্যোক্তা। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় পড়ালেখা থেমে গেলেও থেমে থাকেননি ওমর ফারুক। পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান বিদেশে, মালয়েশিয়ায়। সেখানে টানা ১২ বছর কাজ করে পরিবার ও নিজের ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করেন।
২০২৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, কঠোর পরিশ্রম এবং সঞ্চিত অর্থকে পুঁজি করে শুরু করেন নতুন একটি উদ্যোগ-গরুর মোটাতাজা খামার। গ্রামের পরিবেশ, খামারের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রথমে ১১টি গরু দিয়ে খামার শুরু করেন। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার ফলে এক বছরের মধ্যেই তিনি খামারের প্রথম সফলতা দেখতে পান।
২০২৫ সালে ওমর ফারুক তার খামার থেকে ১৫টি গরু বিক্রি করেন। ঈদুল আযহা উপলক্ষে কোরবানির হাটে এসব গরু তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রি হয়। তিনি জানান, ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে গরুর খামার থেকে সহজেই লাভবান হওয়া যায়। বর্তমানে তার খামারে ১১টি গরু রয়েছে এবং তিনি আরও নতুন ৮টি গরু কেনার পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে খামারের পরিধি বাড়িয়ে অধিক লাভের সুযোগ তৈরি করতে চান।
খামারের প্রতিদিনের কাজকর্ম তিনিই একা সামলান। গরুদের সময়মতো খাওয়ানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা-সবকিছুই তিনি মনোযোগের সঙ্গে করেন। গরুর খাদ্য তালিকা নিয়েও রয়েছে তার সচেতনতা। গরুদের তিনি নিয়মিত খাওয়ান ভূষি, চালের কুঁড়া, খৈল, সয়াবিন, খড় এবং সবুজ ঘাস। এই সুষম খাদ্য গরুর দ্রুত ও স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
গরু অসুস্থ হলে তিনি আর দেরি করেন না; বরং স্থানীয় প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত চিকিৎসা করান। এই দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই তাকে একজন দক্ষ খামারিতে পরিণত করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, যে কেউ ইচ্ছা থাকলে এবং পরিশ্রম করতে পারলে খামার করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।
ওমর ফারুকের এই উদ্যোক্তা হওয়ার পথ মোটেই সহজ ছিল না। প্রাথমিকভাবে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, কেউ কেউ বলেছিল, “বিদেশে এত কষ্ট করে টাকা রোজগার করে দেশে এসে গরু পালা।” কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সৎ উদ্দেশ্য, পরিশ্রম ও পরিকল্পনা থাকলে দেশের মাটিতেও
সফল হওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, “বিদেশে থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। বিশেষ করে সময়ের মূল্য, পরিশ্রমের গুরুত্ব, এবং সঞ্চয়ের গুরুত্ব। দেশে এসে যখন খামার শুরু করি, তখন আমি জানতাম এটা সহজ হবে না। কিন্তু আমি মন থেকে চেয়েছিলাম কিছু একটা করতে। এখন আমি খুশি, আমি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছি।”
বর্তমানে তার খামারে কিছু স্থান নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে নতুন গরু রাখার জন্য। নিজের সঞ্চয় ছাড়াও এখন তিনি ব্যাংক লোন নেওয়ার কথা ভাবছেন, যাতে খামারের পরিধি আরও বাড়ানো যায় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তার লক্ষ্য ভবিষ্যতে ৫০টির বেশি গরু নিয়ে একটি বড় খামার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে গ্রামের আরও কয়েকজন যুবককে কাজের সুযোগ দিতে পারবেন।
ওমর ফারুক এখন কেবল একজন খামারি নন, তিনি স্থানীয় যুবকদের কাছে একজন অনুপ্রেরণা। অনেকেই তার খামার দেখে উৎসাহিত হয়ে গরু পালনের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি সময় পেলেই তরুণদের পরামর্শ দেন, “নিজের এলাকায় কিছু করার চেষ্টা করো। প্রাথমিকভাবে ছোট করে শুরু করো, অভিজ্ঞতা হবে, ভুল হবে, শিখবে-
একদিন বড় হবেই।”
সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বা সহযোগিতা পেলে আরও বেশি উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, গরুর খামার একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় খাত, তবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং বাজার বিশ্লেষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এইভাবেই একজন সাধারণ প্রবাসী কর্মী থেকে একজন সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন ওমর ফারুক। তার এই গল্প প্রমান করে, সাহস, পরিশ্রম এবং পরিকল্পনা থাকলে যে কেউ নিজের জীবন পরিবর্তন করতে পারেন। গরুর খামার তার জন্য শুধু একটি পেশা নয়, বরং এটি তার স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয় এসাথে দপ্তরের বিভিন্ন কাজ ও পরিচিতি দেয়া হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার
কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য প্রাণীসম্পদ তথ্য দপ্তর
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা
