কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলার এক শান্তিপূর্ণ গ্রাম-বাঁওড়া। এখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা মো. নুরু মিয়ার। শৈশব থেকেই মাটির গন্ধ আর প্রকৃতির ছোঁয়ার সাথে বড় হয়েছেন তিনি। তবে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজটি ছিল মাছ ধরা ও মাছ পালন। গ্রামের ছোট পুকুরঘেরা পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে একসময় মাছ চাষ তার পেশা হয়ে দাঁড়ায়।বর্তমানে মো. নুরু মিয়া ৫০ বছর বয়সী এক সফল খামারী। তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রম, ধৈর্য, এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, তিনি শুধু নিজেই সাবলম্বী হননি, বরং পরিবারকেও করেছেন স্বনির্ভর। দুই ছেলে এবং এক মেয়ের জনক তিনি। মাছচাষ থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়েই দুই ছেলেকে পাঠিয়েছেন বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য, আর একমাত্র মেয়েকে করেছেন পাত্রস্থ।
মো. নুরু মিয়ার মাছচাষের যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। গ্রামের একটি ছোট পুকুরে তিনি শখের বসে কিছু রুই, কাতলা ও তেলাপিয়া মাছ ছাড়েন। সেই সময় তার কোনো আধুনিক জ্ঞান ছিল না, ছিল কেবল আগ্রহ ও ধৈর্য। তিনি স্থানীয়ভাবে অভিজ্ঞ মানুষদের থেকে পরামর্শ নিতেন। কিছু মৌসুমের অভিজ্ঞতার পর তিনি বুঝতে পারেন, মাছ চাষে ভালো পরিকল্পনা, সময়মত যত্ন ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করলে অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। তখন থেকেই তিনি আরো পরিকল্পিতভাবে খামার পরিচালনা শুরু করেন
মো. নুরু মিয়া মাছচাষকে পেশা হিসেবে শুরু করার পর প্রথমেই গুরুত্ব দেন পোনা উৎপাদনে। তিনি স্থানীয় হ্যাচারি থেকে উন্নতমানের রেণু সংগ্রহ করে নিজেই পোনা তৈরি করেন। পোনা উৎপাদনের জন্য রয়েছে তার আলাদা পুকুর। সেখানে তিনি প্রাকৃতিক নিয়মে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পোনাগুলো বড় করে তোলেন। প্রতি মৌসুমে এসব পোনা তিনি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। লালমাই ও আশপাশের এলাকাগুলোতে তার খ্যাতি এখন একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। খামারিদের অনেকে তার কাছ থেকেই পোনা সংগ্রহ করেন, কারণ তার উৎপাদিত পোনার মান ভালো এবং মাছের বৃদ্ধি হারও সন্তোষজনক। পোনা বিক্রির মৌসুম শেষ হলে অবশিষ্ট পোনাগুলো তিনি নিজের পুকুরে ছাড়েন। এরপর নিয়মমাফিক খাদ্য সরবরাহ এবং যত্ন নিয়ে বড় করে তোলেন মাছগুলো। মাছের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে তিনি মাঝেমধ্যে জাল দিয়ে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এ সময় তিনি খামারে দুইজন অভিজ্ঞ শ্রমিক নিয়োজিত রাখেন যারা খামারের প্রতিদিনের কাজ সামলান-খাদ্য সরবরাহ, পানি পরিষ্কার, পুকুরের তদারকি ইত্যাদি।
বর্তমানে মো. নুরু মিয়া যে মাছগুলো চাষ করেন সেগুলো হলো: রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, পাঙ্গাস এবং তেলাপিয়া। এই মাছগুলোর চাহিদা বাজারে প্রচুর এবং দামও ভালো। বিশেষ করে পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া বর্তমানে দ্রুতবর্ধনশীল মাছ হিসেবে পরিচিত, যা খামারিদের জন্য লাভজনক। তিনি মাছগুলো চাষের সময় পরিবেশের প্রতি বিশেষ যত্ন নেন। পুকুরে সঠিক মাত্রায় জৈব সার ব্যবহার করেন, নিয়মিত পানি পরীক্ষা করেন এবং মাছের রোগবালাইয়ের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ গ্রহণ করেন। তার এই পদ্ধতিগত কাজের ফলেই মাছের মৃত্যু হার কম এবং উৎপাদন হার বেশি।
তিনি বিশ্বাস করেন, “পরিশ্রম করলে কখনো কেউ পিছিয়ে পড়ে না। মাছচাষ যদি নিয়ম মেনে করা যায়, তাহলে মৎস্যভিত্তিক এই পেশাও হতে পারে কোটি টাকার স্বপ্ন পুরণের সিঁড়ি। “তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হলো নিজের খামারকে একটি আধুনিক মাছচাষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য তিনি পুকুরে আধুনিক প্রযুক্তি অক্সিজেন সাপ্লায়ার স্থাপনের চিন্তা করছেন।
মো. নুরু মিয়ার জীবনচিত্র আমাদের দেখায়, সীমিত সম্পদ, অল্প শিক্ষায়ও যদি মনোবল, পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকে, তাহলে জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। তার জীবন শুধু তার নিজের নয়, বরং দেশের অনেক খামারীর জন্য একটি অনুপ্রেরণা। তার মতো মানুষরা আমাদের মনে করিয়ে দেন- “মৎস্যই সমৃদ্ধি”, আর একে যদি বিজ্ঞান ও নিষ্ঠার সাথে পরিচালনা করা যায়, তবে সেটিই হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয় এসাথে দপ্তরের বিভিন্ন কাজ ও পরিচিতি দেয়া হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার
কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য প্রাণীসম্পদ তথ্য দপ্তর
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা
