কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার ছোট্ট কিন্তু প্রাণবন্ত একটি গ্রাম কালকেরপাড়। গ্রামটির চেনা পরিচিত দৃশ্য-খোলা মাঠ, কাঁচা রাস্তা, সকালবেলা হালকা কুয়াশা আর মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস। ঠিক এই শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর এক অসাধারণ স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন হাজী মো. খুরশেদ আলম। তাঁর খামারের নাম হাজেরা ডেইরি এগ্রো ফার্ম- যা আজ কেবল একটি খামার নয়, বরং একটি জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
আট বছর আগে, যখন হাজী মো. খুরশেদ আলম ডেইরি খামার করার কথা ভাবেন, তখন তিনি মূলত মোটাতাজাকরণ খামার দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। গরু মোটাতাজা করে বিক্রির ধারণা তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি বুঝতে পারেন, এই খাতে খরচ অনেক বেশি, লাভ তুলনামূলকভাবে কম। সেই সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি দুধ উৎপাদনমূলক একটি খামার গড়ে তুলবেন-যেখানে নিয়মিত আয় থাকবে, এবং খামারটি হবে পরিবেশবান্ধব।এই ভাবনা থেকেই
জন্ম নেয় হাজেরা ডেইরি এগ্রো ফার্ম। বর্তমানে হাজেরা ডেইরি খামারে মোট ৪৫টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে: ১৮টি দুধ দেওয়া গাভী,৭টি গর্ভবতী গাভী,১২টি বকনা বাছুর, ৪টি ষাঁড়,৪টি ছোট বাচ্চুরএই গরুগুলোর প্রতিদিনের যত্ন ও পরিচর্যা করতেই গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত খামার কাঠামো। তিনজন অভিজ্ঞ ও নিবেদিত শ্রমিক প্রতিদিন খামারের সমস্ত কাজ করে থাকেন-খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘাস কাটা, ফিড তৈরি, দুধ দোহন সবই তাঁরা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে খামারে প্রতিদিন প্রায় ২৮০ লিটার দুধ উৎপন্ন হয়। স্থানীয় বাজারে প্রতি লিটার দুধ তিনি ৭৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২১,০০০ টাকা আয় হয় শুধু দুধ বিক্রি থেকেই। সাপ্তাহিক আয় প্রায় ১,৪৭,০০০ টাকা এবং মাসে প্রায় ৬ লক্ষ টাকার মতো দুধ বিক্রির সম্ভাবনা থাকে।
এই আয় কেবল হাজী মো. খুরশেদ আলমকেই স্বচ্ছল করেনি, বরং গ্রামে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে-যেখানে সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠা থাকলে কৃষিভিত্তিক খাতেও সফল হওয়া সম্ভব।
গরুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। খামারের খাদ্য তালিকায় রয়েছে খৈল, ভুষি, কুড়া, সবুজ ঘাস, তৈরি করা প্রোটিন ফিড। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সবুজ ঘাসের ব্যবস্থা। তিনি নিজেই ১২০ শতক জমিতে ঘাস চাষ করেছেন, যা খামারের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান। এতে খরচ কমে গেছে এবং গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষমতাও বেড়েছে।
গরুর যত্নে কোনো ছাড় নেই। যদি কোনো গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে খুরশেদ আলম সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ওষুধ দ্রুত সরবরাহ করা হয়। এই কার্যকরী যোগাযোগ খামার পরিচালনায় বড় একটি শক্তি হিসেবে কাজ করে।
তিনি বলেন, “খামারে গরু অসুস্থ হলে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে বড় ক্ষতি হয়। তাই অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বাধ্যতামূলক। সরকারিভাবেও অনেক
সহায়তা মেলে, শুধু উদ্যোগ থাকতে হয়।”
তিনজন শ্রমিক এই খামারের প্রাণ। তারা শুধুমাত্র শ্রমিক নয়, বরং পরিবারের মতো হয়ে গেছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গরুদের যত্ন নেওয়া, দুধ দোহন, গোবর পরিষ্কার, খাবার মেশানো-সব কাজে তাঁরা আন্তরিকভাবে জড়িত।
তিনি বিশ্বাস করেন, একটি সফল খামার কেবল আয় করতেই পারে না, বরং এটি গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
গ্রামের মানুষ এখন হাজী মো. খুরশেদ আলমকে দেখেন এক সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। তরুণেরা তাঁর কাছে এসে পরামর্শ নেন কীভাবে খামার শুরু করতে হয়। অনেকে তাঁর পথ অনুসরণ করে ছোট ছোট গরুর খামার গড়ে তুলছেন।তিনি বলেন, “আমি চাই, গ্রামের তরুণরা চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজের গ্রামেই কিছু করুক। দুধ খামার একটা বড় সম্ভাবনার জায়গা।”
হাজেরা ডেইরি এগ্রো ফার্ম কেবল একটি খামার নয়, এটি একটি জীবন্ত উদাহরণ-যেখানে রিশ্রম, পরিকল্পনা এবং ভালোবাসা মিলেমিশে গড়ে উঠেছে এক টেকসই স্বপ্ন। গ্রামের সাধারণ একজন মানুষ কিভাবে ধীরে ধীরে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন, সেই অনুপ্রেরণার নামই হলো হাজী মো. খুরশেদ আলম এবং তাঁর হাজেরা ডেইরি।এই খামার শুধু তাকে নয়, আশেপাশের অনেক পরিবারকে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। এমন উদ্যোগ যদি দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে আত্মনির্ভরশীল একটি বাংলাদেশ গড়া মোটেও অসম্ভব নয়।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয় এসাথে দপ্তরের বিভিন্ন কাজ ও পরিচিতি দেয়া হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার
কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য প্রাণীসম্পদ তথ্য দপ্তর
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা
