নভেম্বর ১৭, ২০২৫ খ্রি.
বাংলাদেশে উচ্চ বেকারত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ খুঁজছেন হাজার হাজার তরুণ। সেই পথের দিশা দেখিয়েছেন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার এক তরুণ উদ্যোক্তা, যিনি চাকরির পেছনে না ছুটে পোল্ট্রি ফার্ম স্থাপন করে শুধু নিজেই স্বাবলম্বী হননি, বরং দেশের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর গুরুদায়িত্বেও অংশ নিয়েছেন। আব্দুল্লা পোল্ট্রি ফার্মের এই সফল যাত্রা বর্তমানে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাঁচ বছর আগে চাকরির অনিশ্চিত গণ্ডি পেরিয়ে আব্দুল্লা পোল্ট্রি ফার্মের মালিক আত্ম-কর্মসংস্থানের পথে হাঁটার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। এখন তার খামারে তিনটি শেডে প্রায় ৩,০০০টি ব্রয়লার মুরগি পালিত হচ্ছে । এটি শুধু একটি খামার নয়, এটি হাজারো তরুণকে দেখিয়ে দিচ্ছে—নিজস্ব উদ্যোগ ও কঠোর পরিশ্রম কীভাবে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। বর্তমানে ফার্মের ২১ দিন বয়সী ব্রয়লার মুরগিগুলোর গড় ওজন ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। উন্নত মানের ফিড ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করছেন। খামারের সার্বিক তদারকির পাশাপাশি তিনি একজন স্থায়ী শ্রমিককে মাসিক ১২,০০০ টাকা বেতনে নিয়োগ করেছেন, যা গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছে।
জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র খামারগুলোর ভূমিকা
আব্দুল্লাহর মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলোই বাংলাদেশের প্রায় পোল্ট্রি শিল্পকে গতিশীল রাখছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা মেটাতে এই খাত এখন অপরিহার্য। যদিও বড় কর্পোরেট ফার্মগুলো বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে, কিন্তু আব্দুল্লাহর মতো স্থানীয় খামারিরা গ্রামেগঞ্জে মাংস ও ডিমের সরবরাহ নিশ্চিত করে ভারসাম্য বজায় রাখছেন।
তবে এই শিল্পে চ্যালেঞ্জের অভাব নেই। সম্প্রতি ফিডের আকাশছোঁয়া দাম এবং বাজারজাতকরণের অস্থিরতা খামারিদের মুনাফায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। তা সত্ত্বেও, নতুন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে এই তরুণ উদ্যোক্তারা টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
আব্দুল্লা পোল্ট্রি ফার্মে মুরগি পালনে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তাপমাত্রার ভিন্নতা অনুযায়ী আলোক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এই খামারে কঠোরভাবে মানা হয়—গ্রীষ্মকালে ২৪ ঘণ্টা এবং শীতকালে ১০ থেকে ২০ দিনের বিশেষ আলোক ব্যবস্থা রাখা হয়।
মুরগির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই খামারের মালিক অত্যন্ত সচেতন। নিয়মিতভাবে রানীক্ষেত, গাম্বোরোসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা প্রদান করা হয়। খামারের মালিক জানান, যেকোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে তিনি স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখেন। বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক পরামর্শের জন্য সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত এই সহযোগিতা খামারিদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
পোল্ট্রি ব্যবসার পাশাপাশি রাইস মিল পরিচালনার অভিজ্ঞতা আব্দুল্লাহকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় আরও মজবুত ভিত্তি দিয়েছে। তিনি এখন এই ব্যবসার সম্প্রসারণের দিকে নজর দিচ্ছেন। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো ব্রয়লারের পাশাপাশি একটি লেয়ার মুরগির (ডিম উৎপাদন) ইউনিট স্থাপন করা। এটি কেবল তার ব্যবসার ঝুঁকি কমাবে না, বরং ডিমের বাজারেও তার অংশীদারিত্ব বাড়াবে।
আব্দুল্লা পোল্ট্রি ফার্মের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক জ্ঞান এবং তরুণদের উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয় সম্মিলিত হলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও যুব সমাজকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগগুলোই আগামী দিনের চালিকাশক্তি।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী:
খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
তরুণ উদ্যোক্তা আব্দুল্লার খামারে তিনটি শেডে প্রায় ৩,০০০টি ব্রয়লার মুরগি
40
