কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে মাছ চাষ করে কীভাবে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজের উদাহরণ হওয়া যায় তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মহালক্ষ্মী পাড়ার সফল মৎস্য চাষি মোহাম্মদ মুসলিম। দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি আজ ওই অঞ্চলের একজন অনুপ্রেরণাদায়ী উদ্যোক্তা।
১৯৮৪ সালে ১টি পুকুরে কার্প জাতীয় মাছ চাষের মাধ্যমে ছোট পরিসরে মৎস্য খাতে যুক্ত হয়েছিলেন মুসলিম। সময়ের ব্যবধানে এবং তার কঠোর পরিশ্রমে এই পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে তিনি একসঙ্গে ৩৫টি পুকুরে মৎস্য চাষের পাশাপাশি গবাদি পশু লালন-পালনও পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে তিনি ২০ একর পরিমাণ জায়গা নিয়ে মোট ৭টি পুকুরে সমন্বিত ও মিশ্র মাছ চাষ করছেন।

বর্তমানে তার ৬৫ শতাংশের একটি মজুদ পুকুরে প্রায় ৩৬ হাজার পিস মিশ্র প্রজাতির মাছের পোনা মজুত করেছেন। তার খামারে চাষ হওয়া প্রধান মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঙ্গাস, রুই, মৃগেল ও কাতল।
মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে তিনি নিয়মিত উন্নতমানের কমার্শিয়াল ফিড ব্যবহার করেন। বর্তমানে তার খামার থেকে বছরে ১০০ টনেরও বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত প্রতিটি মাছের ওজন গড়ে ১ কেজি থেকে শুরু করে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা স্থানীয় ও জাতীয় বাজারে ভালো দামে বিক্রি হয়।
মৎস্য চাষের পাশাপাশি তিনি সফলতার সঙ্গে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তার এই খামারে দুজন নিয়মিত শ্রমিক সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া পুকুর সংস্কার ও মাছ ধরার মৌসুমে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে অনেক অনিয়মিত শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ এই যাত্রাপথ সবসময় মসৃণ ছিল না। খামার পরিচালনায় তাকে বিভিন্ন সময় নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক বন্যায় তার পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগও তার মনোবলকে ভাঙতে পারেনি; তিনি আবারও নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
বেকার যুবকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে মোহাম্মদ মুসলিম বলেন, “বেকারত্ব দূর করতে মৎস্য চাষ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। কোনো বেকার যুবক যদি মাছ চাষে আসতে চান বা পরামর্শ চান, আমি তাদের বিনামূল্যে সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করব।”
মাছ চাষে তার এই দীর্ঘ অবদানকে উৎসাহিত করতে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর থেকে তাকে বিনামূল্যে মৎস্য চাষ সম্পর্কিত বিভিন্ন সহায়ক মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।
উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মুসলিমের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পথচলা শুধু তার একার উন্নতি ঘটায়নি, বরং এলাকার বেকার তরুণদের জন্য মৎস্য খাতে স্বাবলম্বী হওয়ার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদক: খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
