প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ছোঁয়ায় বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দুগ্ধ ও গবাদিপশু খামার খাত এক নতুন দিগন্তে মোড় নিয়েছে। একসময় সনাতন পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করা হলেও বর্তমানে দেশের শিক্ষিত তরুণরা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক খামার গড়ে তুলছেন। এতে যেমন রোগবালাই ও খামার নিরাপত্তার ঝুঁকি কমছে, তেমনি বাড়ছে উৎপাদনশীলতা। এমনই এক আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর খামারের দেখা মিলেছে কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ভিজোড়া গ্রামে। অদ্য ১ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি. মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিদর্শনের সময় উঠে আসে খামারি বিল্লাল হোসেন বাবুর সফলতার চিত্র।
খামারটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করেছেন খামারি বিল্লাল। পুরো খামারটি তিনি সিসি (CCTV) ক্যামেরার আওতাভুক্ত করে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করেন। এর ফলে ঘরের বাইরে বা দূরে থাকলেও সিসি ক্যামেরার সাহায্যে গরুর সার্বিক অবস্থা, কর্মীদের নিয়মিত কাজ, খাদ্য সরবরাহ এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে মনিটর করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির এই সংযোজন খামারের নিরাপত্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগব্যাধি প্রাথমিক অবস্থায় চিহ্নিত করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে।

২০২২ সালের শেষের দিকে গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলেন বিল্লাল হোসেন বাবু। শুরুতে ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় কৌশল পরিবর্তন করেন তিনি। ষাঁড় বাদ দিয়ে জোর দেন দুগ্ধজাত গাভী পালনে। কীভাবে খামার গড়ে তোলার উৎসাহ পেলেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান, “ছোটবেলা থেকেই কাকার সাথে গরু লালন-পালনের কাজে সম্পৃক্ত ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ও ভালোলাগা থেকেই মূলত বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলার চিন্তা করি।”
বর্তমানে বিল্লালের খামারে দুটি শেডে মোট ৩৪টি গবাদিপশু রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি দুধেল গাভী হলেস্টাইন ফ্রিজিয়ান জাতের, ৮টি বকনা এবং ৬টি ষাঁড় গরু রয়েছে। গাভীগুলো থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লিটার করে দুধ পাওয়া যায়। ফলে খামারটিতে দৈনিক সর্বমোট প্রায় ৩০০ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদিত এই দুধ ব্রাহ্মণপাড়া শহরের বিভিন্ন দোকানে প্রতিদিন সরবরাহ করা হয়।

খামারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খামারি জানান, প্রক্রিয়াজাত রেডি ফিডের পাশাপাশি তিনি নিজের তৈরি পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করেন। তবে খামার পরিচালনায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইতিপূর্বে ফুড পয়জনিং ও অন্যান্য নানা রোগে তাঁর কয়েকটি গরু মারা যায়, যা তাকে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
বর্তমানে কীভাবে গরুর পরিচর্যা ও চিকিৎসা করেন জানতে চাইলে বিল্লাল হোসেন বলেন, ” স্থানীয় পশু চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শে খামার পরিচালনা করি। এছাড়া সরকারি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।”
বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক খামার স্থাপন শুধু প্রোটিনের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নানা প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় দেশে এখন বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক খামার ব্যবস্থার বিকাশ ঘটছে। খামারটিতে বর্তমানে বিল্লাল ছাড়া আরো ৩ জন কর্মচারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষিত তরুণ সমাজ যারা এ খাতে আসতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে বিল্লাল হোসেন বলেন, “হুট করে বড় পরিসরে শুরু না করে, শুরুতে কম পরিসরে এবং কম সংখ্যক গবাদিপশু নিয়ে কাজ শুরু করা উচিত। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বাড়লে খামার বড় করলে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারবে।”
পরিদর্শন শেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে খামারি বিল্লাল হোসেন বাবুকে গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসম্মত বিজ্ঞানভিত্তিক গরু মোটাতাজাকরণ সংক্রান্ত দিকনির্দেশনামূলক প্রকাশনা ও অন্যান্য মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদক :
খালেক হাসান
কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
