একসময় যা শুরু হয়েছিল ছোট একটি পুকুরে মাত্র ১৯ হাজার টাকা লাভের মুখ দেখে, সেই সামান্য ব্যবসাই এখন পরিণত হয়েছে ২৪ একরের এক বিশাল মৎস্য সাম্রাজ্যে। বলছিলাম কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বারেশ্বর গ্রামের অদম্য উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আবু নাইমের কথা। ২০০৫ সালে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে মাছ চাষ শুরু করা আবু নাইম আজ পুরো এলাকায় এক সফল মৎস্য চাষি হিসেবে পরিচিত।
তার প্রতিষ্ঠিত ‘সাইমন মৎস্য খামার’ এখন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
২০০৫ সালে শুভাকাঙ্ক্ষী এক পোনা ব্যবসায়ীর পরামর্শে প্রথম পুকুর কাটেন আবু নাইম। প্রথম বছরেই ১৯ হাজার টাকা লাভ হওয়ায় তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় বহুগুণ। পরের বছরই বাণিজ্যিকভাবে নামেন মাঠে, আর এক লাফে লাভ করেন প্রায় ৮ লাখ টাকা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। আত্মকর্মসংস্থানের যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ তা পূর্ণ রূপ পেয়েছে।

বর্তমানে তার খামারে রয়েছে মোট পাঁচটি বিশাল আকারের পুকুর, যার মোট আয়তন ২৪ একর। পুকুরগুলোতে রুই, পাঙ্গাস, তেলাপিয়ার পাশাপাশি গ্রাস কার্প, ব্ল্যাক কার্প ও ক্যাটফিশের মতো বাণিজ্যিক মাছ চাষ করা হচ্ছে। কিছু পুকুরে মিশ্র এবং কিছু পুকুরে এককভাবে সাদা মাছ চাষ করেন তিনি। খামারের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আবু নাইম জানান, খামারে প্রতিদিন গড়ে এক টন ফিড লাগে। খাদ্য খরচ কমাতে ও মাছের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিতে তিনি এক বেলা কোম্পানির ফিড দেন এবং অন্য বেলা কাঁচা ঘাস ব্যবহার করেন। পানির গুণগত মান ঠিক রাখতে ও রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত পুকুরে চুন ছিটানো হয়। বড় কোনো রোগবালাই না থাকলেও যেকোনো প্রয়োজনে ফিড কোম্পানির টেকনিশিয়ানরা এসে দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে যান।
প্রযুক্তির বিচারেও খামারটি বেশ এগিয়ে। নিরাপত্তার জন্য পুরো খামারজুড়ে রয়েছে সিসি ক্যামেরা, পানি সরবরাহে রয়েছে শক্তিশালী মোটর, আর দেখাশোনার জন্য নিজস্ব নৌকা। সরঞ্জাম ও খাদ্য সুরক্ষায় শেডও তৈরি করা হয়েছে। খামারে সার্বক্ষণিক দুইজন নিয়মিত কর্মচারী কাজ করছেন, আর পুকুর সেচ বা মাছ ধরার সময় বাড়তি অনিয়মিত শ্রমিক রাখা হয়।

মাছ বিক্রির কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি সাধারণত ১ কেজি সাইজের মাছ পুকুরে ছাড়েন এবং সেগুলো ৫ থেকে ৭ কেজি ওজন হলে তবেই বাজারে তোলেন। বছরে একবার একযোগে এই বড় সাইজের মাছ বিক্রি করে এককালীন বড় মুনাফা পান। নিজের অদম্য ইচ্ছায় আজ তিনি সুসংগঠিত পরিবারের প্রধান। মৎস্য খামারের পাশাপাশি তার রয়েছে মহিষ ও গরু। পাঁচ ছেলে, ২ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার যৌথ পরিবার এখন সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী। সম্প্রতি তার এই সাফল্য পরিদর্শন করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর। দপ্তরের পক্ষ থেকে খামারি আবু নাইমকে আধুনিক মাছ চাষ বিষয়ক বিভিন্ন বিনামূল্যে মুদ্রণ সামগ্রী ও দিকনির্দেশনামূলক লিফলেট উপহার দেওয়া হয়।


নতুনদের উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ এই উদ্যোক্তার বার্তা বেশ স্পষ্ট “না বুঝে হুট করে চাষে নামলে লোকসান হতে পারে। মাছ চাষে প্রয়োজন ধৈর্য আর পরম যত্ন।” নতুন কেউ এই পেশায় আসতে চাইলে নিজের খামারে তাদের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। ভবিষ্যতে তার এই মৎস্য খামারকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে আবু নাইমের।
প্রতিবেদক: খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
