১৪ জুলাই ২০২৫, কুমিল্লা :
বাংলাদেশ গত কয়েক বছর আগে মাছে সয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এই অর্জনের পেছনে যাঁরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ২ নং উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী লিটন। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে কুমিল্লা জেলা সারাদেশে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মাছ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই জেলায় মাছ উৎপাদনের এই বিশাল পরিমাণে অবদান রাখছেন এমন মৎস্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে লিটন অন্যতম।
বিদেশে পাড়ি জমিয়ে ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী লিটন। বহু চেষ্টা করেও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে তিনি হার মানেননি। নিজের মাটি, নিজের জলেই তিনি গড়েছেন সাফল্যের নতুন এক দৃষ্টান্ত। এখন তিনি কুমিল্লা জেলার অন্যতম সফল একজন মৎস্য উদ্যোক্তা; যার খামার ৭০ একর জুড়ে বিস্তৃত এবং যেখান থেকে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৪২০ টন মাছ। ২০১০ সালে মাত্র ৬ মাসের জন্য দুইটি পুকুর লিজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। প্রথম বছরেই ব্যবসায় আয় হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। তারপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। দুর্গাপুরে ২৬ একর জায়গা ছাড়াও কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর লিজ নেওয়া সহ বিভিন্ন এলাকায় তার খামার ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে তিনি মা মৎস্য খামার নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিশ্র প্রজাতির মাছ চাষ করছেন ; যার মধ্যে রয়েছে রুই, কাতল, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙ্গাস, গুলশা ও অন্যান্য দেশি মাছ।

খামারে প্রতিদিন ১৬ জন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের দৈনিক মজুরি ১৫ হাজার টাকা। মাছ ধরার মৌসুমে বাড়তি লোকবল নিয়োগ দিতে হয়। তিনি এসএমএস ফিড ব্যবহার করেন এবং নিজেই এসএমএস ফিড কোম্পানির একজন ডিলার হিসেবে বিভিন্ন সুবিধা পাচ্ছেন। খামারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা তার চলার পথকে করেছে মসৃণ। মোহাম্মদ আলী লিটন জানান, মাছের বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নিয়মিত। কৃষি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে খামার সম্প্রসারণ করেছেন এবং ফিড কোম্পানিগুলোর সহায়তাও পাচ্ছেন। সফলতা শুধু মৎস্য খাতেই নয়-লিটন গড়ে তুলেছেন একটি প্রাণিসম্পদ খামারও। কাচারীতলায় স্থাপিত খামারে প্রথমে ৩ হাজার লেয়ার মুরগি দিয়ে শুরু করেছিলেন। এখন সেই খামারে রয়েছে ১০ হাজার লেয়ার এবং ৩ হাজার সোনালী মুরগি। তিনি কুমিল্লা জেলা পর্যায়ে সফল মৎস্য খামারি হিসাবে ২০১৩ সালে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এবং পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননা। এখন তার স্বপ্ন-জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা অর্জন করা। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।

বেকার তরুণদের উদ্দেশে লিটনের বার্তা, “বসে না থেকে মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন কিংবা পশু খামার গড়ে তুললে নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। প্রয়োজন হলে আমি সব ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।” মৎস্য খাতের উন্নয়নে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের সহজীকরণ প্রক্রিয়ার প্রশংসা করে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেই সাথে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা মহোদয়, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসাথে তার আহ্বান-মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে একটি পৃথক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার যে পরিকল্পনা করছে তা বাস্তবায়ন করার জন্য। যাতে দেশের হাজারো তরুণ লিটনের মতই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে। এ সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা থেকে তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী :
খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য অফিস, কুমিল্লা
