পারিবারিক ঐতিহ্য ও বাবার অদম্য স্বপ্নকে পুঁজি করে আজ সফলতার দারুণ এক গল্প লিখেছেন কুমিল্লার তরুণ উদ্যোক্তারা। আধুনিক মৎস্য চাষে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এলাকার যুবসমাজের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও তাঁর ভাই। কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর এলাকায় অবস্থিত ‘এশিয়া মৎস্য খামার’ এখন পুরো অঞ্চলের সমন্বিত কৃষি ও মৎস্য চাষের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
এই খামারের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এলাকার সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, মরহুম আব্দুস সাদেক মেম্বার। তাঁর হাত ধরেই সূচিত হয়েছিল খামারটির প্রথম পথচলা। পরবর্তীতে বাবার সেই লালিত স্বপ্নকে পরম মমতায় এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর সুযোগ্য সন্তানরা। বর্তমানে খামারটির স্বত্বাধিকারী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং সার্বিক পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর ভাই মো. আলাউদ্দিন।
২০১২ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পরপরই সালাউদ্দিন সরাসরি পারিবারিক খামারের হাল ধরেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার সান্নিধ্যে থেকে মাছ চাষের বাস্তব কৌশল, যত্ন ও খুঁটিনাটি বিষয়ে তাঁর হাতেখড়ি হয়। বাবার আমলেই শুরুতে একটি হ্যাচারি দিয়ে তাঁদের ব্যবসাটি প্রথম দানা বাঁধতে শুরু করেছিল।

কুমিল্লার দুর্গাপুরে প্রায় ৩০ একর সুবিশাল জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই এশিয়া মৎস্য খামারে বর্তমানে মোট ৮টি বিশাল পুকুর রয়েছে। এসব পুকুরে একদিকে যেমন রুই, কাতলা ও মৃগেলসহ বিভিন্ন জাতের কার্প জাতীয় মাছের বৈজ্ঞানিক মিশ্র চাষ করা হচ্ছে, অন্যদিকে এককভাবে চাষ করা হচ্ছে জনপ্রিয় পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া। এই খামারের মূল বিশেষত্ব হলো তারা কোনো ছোট সাইজের মাছ বাজারে ছাড়েন না। প্রতিটি মাছ পুকুর থেকে অন্তত ২ কেজি থেকে ৫ কেজি বা তারও বেশি ওজনের না হওয়া পর্যন্ত তা বিক্রির জন্য তোলা হয় না। ৩০ একরের এই বিশাল প্রজেক্ট থেকে প্রতি বছর গড়ে ২২০ টনেরও বেশি উন্নত জাতের স্বাস্থ্যকর মাছ উৎপাদিত হয়, যা স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারের মৎস্য সরবরাহকে সমৃদ্ধ করছে।
খামারে মাছের দ্রুত ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন প্রায় ২.৫ টন ফিড মাছের প্রয়োজন হয়। খাদ্যের গুণগত মান ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে তারা একটি খাদ্য কোম্পানির ডিলারশিপও পরিচালনা করছেন। মৎস্য চাষের সাথে সমন্বিত কৃষির অংশ হিসেবে খামারটিতে গড়ে তোলা হয়েছে ব্রাউন সোনালী মুরগির খামার, যেখানে বর্তমানে ৭ হাজার ব্রাউন সোনালী মুরগি পালন করা হচ্ছে।

৮ সদস্যের একটি সুসংগঠিত পরিবারের যৌথ প্রচেষ্টায় সালাউদ্দিন ও আলাউদ্দিন দুই ভাই মিলে পুরো খামারটি পরিচালনা করছেন। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের সার্বিক দেখভালের জন্য ৪ জন নিয়মিত দক্ষ কর্মী এবং কাজের ব্যস্ততার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন গড়ে ৮ জন অনিয়মিত কর্মী নিয়োজিত থাকেন। দুই ভাইয়ের অদম্য পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনায় খামারটি আজ একটি লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।
তবে পথচলা সবসময় সহজ ছিল না। মাছ চাষের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে পাঙ্গাস মাছে ভাইরাসজনিত লিভারের সমস্যা কিংবা কার্প জাতীয় মাছে আরগুলাস বা উকুন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও সতর্কতার কারণে তারা দমে যাননি। নিয়মিত পুকুরে চুন, লবণ এবং প্রয়োজনীয় স্বীকৃত ভেটেরিনারি ওষুধ ব্যবহার করে তারা বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ অক্ষুণ্ণ রাখছেন।
তাদের এই কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত ব্যবস্থাপনা ও অসামান্য সাফল্য বিবেচনা করে ২০২৫ সালে জাতীয় স্বর্ণপদক প্রদানের উদ্দেশ্যে খামারটি মনোনয়নের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এছাড়া সরকারি সুযোগ-সুবিধার অংশ হিসেবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর থেকে আধুনিক মৎস্য চাষ বিষয়ক বিভিন্ন মুদ্রণ সামগ্রী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের প্রদান করা হয়েছে, যা খামারটিকে আরও আধুনিক করতে সাহায্য করছে।

দুই ভাইয়ের এই অনন্য অর্জনে তাঁদের পুরো পরিবার তো বটেই, পুরো কুমিল্লা জেলা আজ গর্বিত। সালাউদ্দিন ও আলাউদ্দিন জানান, তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো খামারটির পরিধি ও উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত কৃষি প্রজেক্টে রূপ দেওয়া। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন জাতীয় আমিষের চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে এলাকার বেকার যুবকদের জন্য আরও বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদক: খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
