বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষিখাত ও মৎস্য খাতের ভূমিকা অপরিসীম। বেকারত্ব দূরীকরণ ও আমিষের চাহিদা পূরণে ইদানীং দেশের বহু শিক্ষিত ও উদ্যমী তরুণ কৃষিনির্ভর উদ্যোগে এগিয়ে আসছেন। তেমনই একজন সফল ও সম্ভাবনাময় তরুণ মৎস্য উদ্যোক্তা কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার (বি-পাড়া) কল্পবাস এলাকার জামাল মিয়া। সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যা এবং নিজস্ব উদ্যোগে তিনি মৎস্য খাতে এক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছেন।
২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মৎস্য চাষ শুরু করেন জামাল মিয়া। কল্পবাস এলাকায় তাঁর তিন একর আয়তনের একটি বিশাল পুকুর রয়েছে। যেখানে তিনি রুই জাতীয় মাছের সাথে বিভিন্ন দেশীয় জাতের উচ্চমূল্যের মাছের মিশ্র চাষ করছেন। তাঁর পুকুরে চাষকৃত মাছের তালিকায় রয়েছে গুলশা, পাবদা, পাঙ্গাস, রুই, কাতল ও বিগহেড।

বাজারের কেনা ফিডের পাশাপাশি জামাল মিয়া তাঁর খামারে নিজ হাতে তৈরি পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করেন, যা মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমাতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। খামারের তদারকি তিনি নিজেই করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ করে থাকেন।
পুকুরের পানির গুণমান বজায় রাখতে তিনি নিয়মিত পানির পিএইচ (pH) পরীক্ষা করেন। পিএইচ মান বজায় রাখতে এবং রোগজীবাণু থেকে মাছকে মুক্ত রাখতে পরিমিত পরিমাণে চুন, লবণ ও পটাশ ব্যবহার করেন। বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যার কারণে তাঁর পুকুরের মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জামাল মিয়া জানান, “পুকুরে যে আকারের মাছ ছাড়া হয়, সঠিক খাবারের মাধ্যমে মাত্র তিন মাসের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, হাফ কেজি ওজনের মাছ ছাড়লে তা তিন মাসের মধ্যে এক কেজিতে রূপ নেয়।” তিনি প্রতি তিন থেকে চার মাস পর পর খামার থেকে মাছ বিক্রি করে থাকেন।
মাছের কোনো রোগবালাই দেখা দিলে তিনি নিজে থেকে আন্দাজে ওষুধ ব্যবহার না করে বিভিন্ন মৎস্য কোম্পানির বিশেষজ্ঞ প্রসেস প্রতিনিধি এবং উপজেলা মৎস্য অফিসের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। তাঁদের পরামর্শ ও চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি খামারের মাছ সুস্থ রাখছেন।

মৎস্য চাষের পাশাপাশি জামাল মিয়া একজন বহুমুখী কর্মী। বিকল্প পেশা হিসেবে তিনি প্রাণিসম্পদ বিভাগের অধীনে কৃত্রিম প্রজননকারী হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব ব্যবসাও রয়েছে। মাছের খামারে তিনি ইতোমধ্যে ১২ লক্ষ টাকা মোট বিনিয়োগ করেছেন। খামারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী যে, খুব দ্রুতই এই বিনিয়োগ থেকে বড় অঙ্কের লাভ আসবে।
নতুন ও বেকার তরুণদের উদ্দেশ্যে জামাল মিয়া বলেন, “হুট করে না নেমে আগে মৎস্য চাষ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে এ পেশায় আসলে অবশ্যই লাভবান হওয়া সম্ভব। পাশাপাশি সরকার পরিচালনাধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারলে তা খামার পরিচালনায় আরও অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখে।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে যুব সমাজের একটি বড় অংশ বেকারত্বের মুখোমুখি। তবে জামাল মিয়ার মতো আত্মপ্রত্যয়ী তরুণরা প্রমাণ করছেন যে, সঠিক উদ্যোগ ও পরিশ্রম থাকলে নিজ এলাকাতেই সফল ক্যারিয়ার গঠন করা সম্ভব। বাংলাদেশ এখন মাছ উৎপাদনে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষে অবস্থান করছে, আর এর নেপথ্যে রয়েছে দেশের এমন উদীয়মান তরুণ উদ্যোক্তাদের অবদান। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সরকারি সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এভাবেই জামাল মিয়ার মতো তরুণেরা দেশের আমিষের ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন।
প্রতিবেদক : খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
